News Ticker

Menu

Browsing "Older Posts"

Browsing Category " ENTERTAINMENT "

আসছে ‘মিনিয়ন’রা!

Wednesday, June 24, 2015 /
ভারতীয় বক্স অফিসে হলিউডি ছবির দাপট আপাতত থামার কোনো নাম নেই। আগামী মাসে যে ছবি বলিউডে আসছে, তার কথা শুনে বলিউডি প্রযোজকদের হতাশা আরো বাড়তে পারে। আগামী ১০ জুলাই ভারতে মুক্তি পাচ্ছে বিখ্যাত অ্যানিমেশন সিরিজ ‘ডেসপিকেবল মি’র নতুন ছবি ‘মিনিয়নস’।
কলার মতো দেখতে রোবট শ্রমিকদের আজগুবি সব কাজকারবার আর ভাষার জন্য এই সিরিজের প্রথম দুই ছবিও তুমুল জনপ্রিয় হয়। ‘মিনিয়নস’ এর ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের মুক্তির পর এবার ভারতের বাজারে আসছে পিয়ের কোফিন এবং কাইল ব্যাল্ডার এই ছবিটি।
কেভিন, বব আর স্টুয়ার্ট-এই তিন চরিত্রকে এবার দেখা যাবে দারুণ এক অভিযানের অভিজ্ঞতা নিতে। নতুন ওস্তাদের খোঁজ করতে গিয়ে তাদের দেখা মেলে এক দুর্দান্ত সুপার-ভিলেনের সঙ্গে, নাম যার স্কারলেট ওভারকিল। এই চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন সান্ড্রা বুলক।
এই তারকা অভিনেত্রীর পাশাপাশি জন হ্যাম, মাইকেল কিটন, অ্যালিসন জ্যানির মতো তারকারা কণ্ঠ দিয়েছেন এই ছবিতে। এ ছাড়া ষাটের দশকের একটি জনপ্রিয় গান যুক্ত থাকছে এ ছবির সাউন্ডট্র্যাকে।
বাংলাদেশেও আসার কথা রয়েছে ‘মিনিয়নস’-এর। যদিও এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, তবে এর আগের বেশ কয়েকটি হলিউডি সুপারহিট সিরিজের ছবি (ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস, ট্রান্সফরমার্স, হাঙ্গার গেম) ভারতের সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশের কিছু মুভি থিয়েটারে। সে হিসেবে আশা করা যায়, মিনিয়নদের কাণ্ডকারখানা দেখতে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হবে না দর্শকদের।

এক ছবিতে এবার অভিনয় করতে চলেছেন শাহরুখ-সলমন-আমির

Tuesday, June 23, 2015 /
এক ছবিতে এবার একসঙ্গে অভিনয় করতে চলেছেন বলিউডের তিন খান, সলমন, শাহরুখ এবং আমির। হ্যাঁ, অবশ্যই এটা কোনও কল্পনা নয়, এটাই বাস্তব এবং সেটা ঘটতে চলেছে খুব শীঘ্রই। প্রযোজক সাজিদ নাদিওয়ালা হলেন সেই ভাগ্যবান প্রযোজক, যাঁর প্রযোজনায় একই ছবিতে অভিনয় করতে চলেছেন বলিউডের সবচেয়ে প্রভাবশালী ত্রয়ী,  শাহরুখ-সলমন-আমির। সূত্রের তরফে জানা গেছে, সাজিদ নাদিওয়ালা একটি ছবি প্রযোজনা করবেন, যেখানে এই তিন খান অভিনয় করবেন। শোনা যাচ্ছে তিনি নিজে ছবিটি পরিচালনাও করতে পারেন, তবে পুরোটাই নির্ভর করছে ছবিটি কি বিষয় নিয়ে তৈরি হচ্ছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে শ্যুটিং শুরু হবে এই ছবির এবং সেই তারকাখচিত ছবি মুক্তি পাবে ডিসেম্বর ২০১৭ সালে।
সূত্রের তরফে জানা গেছে ছবির চিত্রনাট্যটা অনেকটা মনমোহন দেশাইয়ের ছবি ‘অমর আকবর অ্যান্টনি’র ধাঁচে তৈরি হবে। প্রযোজকের মূল লক্ষ্যই হল ছবিতে যেন তিনজন তারকাই একইরকম গুরুত্ব পান। কেউ যদি সামান্যও কম গুরুত্ব পান, তাহলে তাঁদের কারর ভক্তরাই প্রযোজককে ছেড়ে কথা বলবে না, সেটাও জানেন প্রযোজক। তাই তিনি যথেষ্ট সময় নিয়ে ২০১৭ সালে এই ছবির শ্যুটিং শুরু করতে চলেছেন।
এর আগে রুপোলি পর্দায় একসঙ্গে শাহরুখ-সলমনকে দেখা গিয়েছিল রাকেশ রোশনের ‘করণ-অর্জুন’, অর্জুন কেসি বোকাডিয়ার ‘হাম তুমহারে হ্যায় সনম’ এবং কর্ণ জোহরের ‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়’-তে। সলমন-আমির একসঙ্গে বলিউডকে উপহার দিয়েছেন হাস্য-কৌতুকে ভরা রাজকুমার সন্তোষির ‘আন্দাজ আপনা আপনা’ ছবিটি। তবে এই ছবি যদি সত্যিই তৈরি হয় তাহলে শাহরুখ-আমিরের একসঙ্গে এটাই প্রথম কাজ হবে। তাঁরা এরআগে একসঙ্গে কাজ করেননি।

৭ কোটি টাকার অফার, ক্যাটরিনার সঙ্গে বিজ্ঞাপনে ‘না’ সলমনের

/
এক সময় তিনিই ছিলেন ক্যাটরিনা কাইফের ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড। কিন্তু আজ সব অতীত। প্রেমিকা ‘প্রাক্তন’ হয়ে গিয়েছেন। তাই তাঁর সঙ্গে পর্দায় আর কোনও কাজেই আগ্রহী নন সলমন খান। সম্প্রতি ক্যাটরিনার সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের শ্যুটিংয়ের জন্য ৭ কোটি টাকার অফার পেয়েছিলেন সলমন। জানা গিয়েছে, বিজ্ঞাপনের প্রস্তাবে যতটা উদ্দীপনা দেখিয়েছেন  ক্যাটরিনা, ততটাই নিস্পৃহ, নিরুতসাহী সলমন। এমনকী শোনা যাচ্ছে, লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখানই করেছেন সলমন।

কিন্তু সলমন তো এব্যাপারে যথেষ্ট খোলামেলা বলেই ইঙ্গিত মিলেছিল। প্রেমিকা ( তা তিনি বর্তমানে যতই প্রাক্তন হোন না কেন) অস্বস্তিতে পড়লে তাঁর পাশেই দাঁড়াতে দেখা গিয়েছে সলমনকে। বিদেশে এক দ্বীপপুঞ্জে রনবীর কপূরের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে বিকিনি বিতর্কে জড়িয়েছিলেন ক্যাটরিনা। কিন্তু রনবীর সে সময় বিষয়টি নিয়ে মুখ না খুললেও সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নে বিপাকে পড়ার হাত থেকে ক্যাটরিনাকে রক্ষা করেছিলেন সলমনই।
শুধু তা-ই নয়, গত বছর নিজের বোন অর্পিতার বিয়ের সময় ক্যাটরিনার সঙ্গে মজায় মেতেছিলেন সলমন। খুনসুটি করে তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে সুযোগ দিয়েছিলাম খান হওয়ার, তুমি কপূর হতে চাইলে’। ৩১ বছর বয়সি নায়িকা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।

তাহলে এত কিছুর পরও কেন ক্যাটরিনার সঙ্গে কাজ করতে আপত্তি সলমনের?
আসলে জনসমক্ষে সপ্রতিভ থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে ক্যাটরিনার সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করতে চান সলমন। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ক্যাটরিনা একসময় আমার ‘বন্ধু’ থাকলেও এখন সে অন্য কারও সঙ্গিনী  এই সম্পর্ককে তিনি সম্মান করেন। তাই কেউ যেন ক্যাটরিনাকে বলার সুযোগ না পায়, ‘ও, তোমার এখনও সলমনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে?’ তিনি চান না, তাঁদের পুরানো সম্পর্কের ছায়া ক্যাটরিনার এখনকার জীবনে পড়ুক।
সে কারণেই ‘বজরঙ্গী ভাইজান’ ছবিতে প্রথমে তাঁর বিপরীতে ক্যাটরিনাকেই নির্বাচন করা হলেও সলমনের আপত্তিতেই তাঁকে বাদ দিয়ে করিনা  কপূরকে নেওয়া হয়। ‘বাজ’ ছবির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল।

কেননা, আজ দুজনার দুটি পথ শুধু দুটি দিকে গেছে বেঁকে!





আলিয়ার এখন ৫০ লাখ অনুসারী

/
বয়স এমন আর কী, মাত্র ২৩ চলছে এখন। তাতে কী, অনুসারী তাঁর রীতিমতো ৫০ লাখ! বলা হচ্ছে আলিয়া ভাটের কথা। সামাজিক মাধ্যম টুইটারে অনুসারীর সংখ্যা গতকাল ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে তাঁর। এনডিটিভির খবরে জানা গেল, এ নিয়ে মহাখুশি আলিয়া বিশেষ ঘোষণা দিয়েছেন টুইটারে।
স্বভাবসুলভ ‘ওয়াও’, ‘ইয়াহু’ গোছের শব্দ ব্যবহার করেই উচ্ছ্বাস জানিয়েছেন আলিয়া। ভক্তদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন সমর্থনের জন্য। একই সঙ্গে জানিয়েছেন, এই খুশিতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে লম্বা গল্প-গুজব করবেন সবার সঙ্গে।
সামাজিক মাধ্যমে খুবই সক্রিয় ভাট ক্যাম্পের এই কনিষ্ঠ সদস্য। পেশাদার এবং ব্যক্তিগত জীবনের বহু বিষয় তিনি ভক্তদের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শেয়ার করেন। ৫০ লাখের উদযাপনেও তারই উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
শাকুন বাত্রার ‘কাপুর অ্যান্ড সন্স’ ছবির শুটিংয়ে এ মুহূর্তে ব্যস্ত আছেন আলিয়া। এ ছবিতে আরো রয়েছেন সিদ্ধার্থ মালহোত্রা, ঋষি কাপুর এবং পাকিস্তানি অভিনেতা ফাওয়াদ খান।
২০১২ সালে করণ জোহরের ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ ছবি দিয়ে বলিউডে অভিষেক ঘটে আলিয়া ভাটের। প্রথম ছবিতেই সফল এই অভিনেত্রীকে কিছুদিন পর দেখা যাবে ‘উড়তা পাঞ্জাব’ ও ‘শানদার’ ছবিতে।

সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেল না সানি লিওনের মস্তিজাদে

Thursday, June 18, 2015 /


নয়াদিল্লি: সানি লিওনের মস্তিজাদে সিনেমার ভবিষ্যত ঘোরতর সংকটে পড়ল। এই ছবির মুক্তির প্রতীক্ষায় ছিলেন সানির অনুরাগীরা। মে মাসেই সিনেমাটির মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জানা গিয়েছে, সিনেমার বেশ কয়েক বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে সেন্সর বোর্ড। ফলে সিনেমাটির মুক্তি পিছিয়ে গিয়েছে।
এর আগে জানা গিয়েছিল, সেন্সর বোর্ডের অনুমতি না পাওয়ায় সিনেমাটির মুক্তি পিছিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য অত্যন্ত ‘সাহসী’ বলেই মনে করছে সেন্সর বোর্ড। তাই মুক্তির অনুমতি দেওয়া হয়নি। এরফলে সিনেমাটির নির্মাতাদের এবার ফিল্ম সার্টিফিকেশন অ্যাপালেট ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হতে হবে।

মামলা ঠুকছেন কঙ্গনা, কেন ?

Wednesday, June 17, 2015 /

সিনেমায় চরিত্র নিয়ে কোনো আপস নেই কঙ্গনার। নায়ক যেই হোক, ছবিতে নিজের চরিত্র পছন্দ হতেই হবে। বাস্তবেও কিন্তু এমন জেদি বৈশিষ্ট্য দেখা যায় এ সময়ের সফলতম বলিউড অভিনেত্রী কঙ্গনার। আর কেউ যদি তাঁর সঙ্গে উল্টোপাল্টা করে, তাহলে তাকে দেখে নিতে ছাড়েন না কঙ্গনা। মিস মালিনীর খবরে জানা গেল, একটি ই-কমার্স সাইটের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছেন তিনি। নিশ্চয় ই-কমার্স সাইটটি কোনো গণ্ডগোল করেছে!
অবশ্য তাঁর রাগের কারণ যৌক্তিকই বলা যায়। ই-কমার্স সাইটটি কঙ্গনার অনুমতি না নিয়েই তাঁর একটি ছবি ব্যবহার করেছে প্রচারণার জন্য। তাও আবার পণ্যটি ছিল ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের। ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের আইডিয়া মোটেও বরদাশত করতে পারেন না কঙ্গনা। তার ওপর তাঁকে না জানিয়ে তাঁর চেহারা প্রচার করেছে সাইটটি। সুতরাং মামলা করবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কঙ্গনা।
কিছুদিন আগেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের ধারণাতেই তিনি বিশ্বাসী নন। কারণ রং নিয়ে ভেদাভেদ মোটেও পছন্দ করেন না তিনি। শুধু তাই নয়, মাসখানেক আগে একটি নামি ব্র্যান্ডের ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের বিজ্ঞাপনে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। এ জন্য অফারও করা হয়েছিল মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক। তবে সে প্রস্তাবে নিজের অবস্থান থেকে মোটেও সরে আসেননি তিনি। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন লোভনীয় প্রস্তাব।
তবে এ নিয়ে ওই সাইটটির তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একই পণ্যের প্রচারণায় সাইটটি ব্যবহার করেছে আরো কয়েকজন অভিনেত্রীর চেহারা। এদের মধ্যে প্রিয়ঙ্কা চোপড়া ও সানি লিওনও রয়েছেন।


শিউলি

Monday, May 18, 2015 /

শিউলি

দীপাঞ্জন বিশ্বাস


নারকেল পাতা থেকে টিনের চালে টুপটুপ শিশির পড়ে। দোতলা থেকে শিউলি গাছটার আবছা জেগে থাকা দেখা যায়। পাশের পাড়ার পুজো প্যান্ডেলে মহালয়ার পর থেকেই ভোররাতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ বাজে। সামনেই প্রথম সেমেস্টার, ভোররাতে মা ডেকে দেয় পড়ার জন্য।
বিদ্যুত্‌হীন গ্রামগুলোয় সন্ধ্যা ঘনায় দ্রুত। আমায় ডেকে দিয়ে কেরোসিন বাতি নিয়ে ঢেঁকিঘরে ধান ভানে মা। ভোররাতে এই ঢেঁকির শব্দ, রাতের হৃদ্স্পন্দন মনে হয়। শিউলি খসা শুরু হয় আর একটু পরে।
মহালয়ার পর থেকেই প্রতীক্ষা শুরু হয়। চোখ চেয়ে থাকে। শিশিরের শব্দ ভেঙে শিউলি গাছের নীচে এসে বসবে দু’টি রাঙা পা নিয়ে মৌবনী। আঁধার পায়ে, চুপিচুপি মৌবনী এসে বসে শিউলিতলায়। হৃদ্স্পন্দন দ্বিগুণ হয়ে যায়। মৌবনীর হাতে ভেঙে যায় শিউলির লজ্জা। নরম হাত খঁুটে নেয় সাদা ফুল। সাজিতে তুলে রাখে। কাঁপা-কাঁপা চোখে চেয়ে থাকি। আমার আলোজ্বলা দোতলার জানলায় চোখ রাখে মৌবনী। চুরি করে দেখে নেয় আমায়। আমি দেখি না, অথবা দেখি অন্ধ শরীর।
আমি শব্দ করে পড়ি। আঁচল ভরে উঠলে ফুলে, উঠে যায় চুপিসারে। মা অন্ধকারে দেখে নেয় মৌবনীর উঠে যাওয়া। ঢেঁকিঘর পেরোতেই মা ডেকে উঠে, ‘‘মৌ কবে এলি?”
“কাল সন্ধে ছ’টায়।”
মৌবনী মায়ের কাছে গিয়ে বসে, আমি পড়া থামিয়ে দিই। মা ঢেঁকির তালে-তালে, মৌবনীকে প্রশ্ন করে চলে। মৌ উত্তর দেয়। দুটো ঢেঁকির শব্দের মাঝে কথাগুলো চেপে আমার কানে আসে।
মা চিত্‌কার করে বলে,‘‘নীল ঘুমিয়ে পড়লি?”
মা এত শব্দের মাঝেও কী করে বোঝে আমি পড়া থামিয়েছি! আবার শব্দ করে পড়তে শুরু করি।
সারা বছর অপেক্ষায় থাকি পুজোর ক’টা দিনের জন্য। এই সময় মামার বাড়ি আসে মৌবনী। দু’ হাতে শিউলি কুড়োয়। সবাই জেগে ওঠার আগে, আমি শিউলিতলায় মৌবনীর পায়ের পাতার দাগগুলো অনুভব করি। দু’ হাত থেকে শিউলি ফুলের উপর ঝরে পড়া আদর, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে সারা শিউলিতলা।
মা সকালে গোবর দিয়ে শিউলিতলা লেপে দেয়। মৌয়ের ছোঁয়া আমাদের আঙিনা থেকে সেদিনের মতো মুছে যায়। শুনেছি, মৌবনীর মায়ের সঙ্গে আমার বাবার প্রেম ছিল। পাড়ায় বিয়ে দিতে রাজি হয়নি ঠাকুরদাদা। দুই পরিবারের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ছিল অনেকদিন। দূর গাঁয়ে মৌবনীর মাকে বিয়ে দিয়েছিল। তাই মৌবনীরা মামাবাড়ি খুব কমই আসত।
হস্টেল থেকে বাড়ি ফিরে ক’টা দিন বাবার শাসনে আর মায়ের আদরে কাটে। পড়া শেষ হলে মা নাড়ু, মোয়া খেতে দেয়।
শেষ আশ্বিনের নদীপাড় জুড়ে কাশ আর হোগলায় মাখামাখি। বড় কাশ ফুলগুলো যেন সমুদ্র ফেনার মতো ছড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতিময়। একমুখী প্রবাহ ছেড়ে নদী ফেরে জোয়ারভাটায়। হৃদয়টাও একমুখী প্রবাহ ছেড়ে ফিরে আসে।
বেলা বাড়লে বাবা মাঠে ডেকে নিয়ে যায়। বাবার সঙ্গে কড়াইশুঁটি ক্ষেতে চাষ করি। দৈর্ঘ্য চাষ, প্রস্থ চাষ, লাঙলফলা বেঁকে যায়। বাবা ধমক দেয়, হাত পেকে ওঠে আমার। বলদের লেজে হাত দিলে অদ্ভুত সব শব্দ বেরোয়। পোষমানা গরুগুলো বাবার কথা বোঝে। আমার শব্দ ওদের কাছে বড্ড অচেনা, তবু বলদ দুটো হেলেদুলে হেঁটে যায়। শক্ত মাটির ঢেলাগুলো পায়ে লাগে, ব্যথায় ককিয়ে ওঠে। আর বুক ভরে নিই মাটিচেরা উষ্ণঘ্রাণ। বুঝি, এখানেই নবজাতক আসবে ক’দিন পর। এটা তারই প্রস্তুতি। তবে বাবাও ‘দাই’। আমিও কি?
রোদ ওঠে। মাঠ থেকে দেখা যায় রাস্তা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মৌবনী লাঙল দিয়ে আমার মাটি চষা দেখে। মাঠ পিষে যায় দুটো জোয়ালের শরীরে। মৌবনীর শরীরে শিহরণ জাগে। হলুদ পাখির মতো নেচে ওঠে মৌবনী। আমি রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি। চাষের লাইন বেঁকে যায়। ঢেলাগুলো পায়ে এসে আরও জোরে লাগে। শিশিরভেজা মাটি পা মুড়ে দেয়। ডান হাত, বাঁ হাতে ঘোরে লাঙলের গুটি। বাবা কোদাল দিয়ে আল কাটে।
সাদা মেঘ ভাসে আকাশে। তুলোর মতো নরম-নরম। লাঙলের সঙ্গে হাতের ঘর্ষণে আমার হাতে ফোসকা পড়ে। তরঙ্গের মতো সারা মাঠে ছড়িয়ে পড়ে লাঙলের চাষ। মাথায় কম্পাঙ্ক, দোলনকাল ঘোরে। ক্লাসের সেরা সেঁজুতি, দোলন কালের অনাবিষ্কৃত সূত্র বোঝায় আমায় একা পেলে, প্র্যাক্টিকাল রুমে, চোখ ও ঠোঁটের ভাষায়। বলদের পায়ে কোনও ব্যাস বা ব্যাসার্ধ থাকে না, গরু দুটো সমান্তরালে এগিয়ে যায়। হিসেব মিলে যায় সহজে।
আর আমি গুলিয়ে ফেলি, এই দুপুর রোদের সঙ্গে সেঁজুতিদের এসি গাড়িতে সুখকর যাপন, স্ট্রেট ভেলোসিটি, রোটেশন-মোশন ও দোলন কালের। চাষ এলোমেলো হয়ে যায় মৌবনী ও সেঁজুতির মাঝখানে। বাবা অশ্লীল ভাষায় নিজেকেই গাল পাড়ে, “নবাবজাদা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের খরচ কোথা থেকে আসে একটু বোঝার চেষ্টা করো, হালটা তো ঠিক করে ধরতে শেখো।”
মৌবনী বিকেলে আমাদের বাড়িতে আসে, আমার পড়ার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ায়। আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “চলো নীলদা, আমাদের বিলের ধার থেকে ঘুরে আসি।”
আমি বলি, “তুই মাকে বল।’’
ও মায়ের কাছে যায়। মাকে বুঝিয়ে রাজি করায়। মা বলে, সন্ধের মধ্যে ফিরে আসিস। মায়ের মনে কি ভয় কাজ করে?
মৌবনী আমাকে টেনে তোলে পড়ার টেব্ল থেকে। দু’জনে হাঁটি। হাঁটতে-হাঁটতে ও আমায় বলে, “আমি কিন্তু কাদা মাখতে পারব না। তুই আমায় কোলে করে নৌকায় তুলে দিবি। বলিস না, লোক দেখবে।’’
বিলের কাছে এলে ওকে কোলে করে নৌকায় তুলে দিই। ও মাচানে বসে থাকে। আমি নৌকা এগিয়ে নিয়ে যাই। মৌবনী জল ছিটিয়ে দেয় আমায়। আমি কোনও কথা বলি না। জানি, বললেও শুনবে না। আমি ওকে সেঁজুতির গল্প বলি।
ও বলে, “ওকে আমি দেখে নেব।”
“আমি তোর কে? যে, আমার জন্য তুই ওকে দেখে নিবি?’’
“তুই শুধুই আমার। এখানে কেউ হাত দিলে, আমি গলায় দড়ি দেব।”
“তুই কী করে জানলি, আমি তোর?”
“ভোরে আমি যখন শিউলি কুড়োতে আসি, তুই পড়া বন্ধ করে তাকিয়ে থাকিস।”
“তুই কী করে বুঝিস?”
“আরে বোকা, তুই তো আলোয় থাকিস, আমি অন্ধকারে। যারা আলোয় থাকে, তাদের তো দেখা যাবেই।”
আমার হাসি পায়। হাতের ফোসকাগুলোয় চাপ লাগে, ব্যথায় ককিয়ে উঠি। মৌবনী বুঝতে পারে।
“নীলদা, তুই লাঙল চালাস কেন, হাতে ফোসকা পড়ে। তুই পারিস এসব?”
“বাবা সারাবছর মাঠে খাটে। আমি এই ক’টা দিন বাবাকে একটু সাহায্য করি। হাড়ভাঙা খেটে বাবা শহরে টাকা পাঠায়, মাও কষ্ট করে।”
“তুই যখন বড় ইঞ্জিনিয়ার হবি, তখন তো এদেরই অনেক সুখ হবে।’’
“জানি না রে!”

পুকুরপাড়ে নৌকা ভেড়াই। দু’জনে নেমে যাই। পুকুরের পাড় জুড়ে পেঁপে, কলা, সুপারি, কয়েকটা আম-জাম গাছ।
হালকা উত্তুরে হাওয়ায়, মৌবনীর গা থেকে বীজতলার গন্ধ ভেসে আসছে। আমি ভাবছি, প্রত্যেক নারী একটা বীজতলা। এখানেই ফসল ফলে আর সেই ফসল আমরা কেটে নিই। সবুজ চুড়িদারে মৌবনীকে একটা শিউলি গাছ মনে হয়।
আমি মৌবনীর চোখে তাকিয়ে বললাম, “আমি তোর শিউলি ফুল দেখব।”
ও বলল, “বোকা, এই বিকেলে কি শিউলি ফোটে? ওটা রাতের ফুল, সূর্য দেখলেই ঝরে যায়।”
“তা হলে হাসনুহানা, গোলাপ, জবা, যা কিছু একটা দেখা।”
আমায় বলল, “আমার চোখের দিকে তাকা, এটা পদ্মকলি। ঠোঁটের দিকে তাকা, এটা গোলাপ পাপড়ি।” পাপড়ির আঘাত দেবে বলেই ওর ঠোঁট আমার ঠোঁটকে জাপটে ধরে। আমার ঠোঁট ভিজে যাচ্ছে গোলাপ জলে।

সন্ধ্যা নামলে আমি আর মৌবনী নৌকায় উঠি। বাড়ি ফেরার সময় মৌবনী বলল, “নীলদা, তুই এই অন্ধকার ভেদ করতে পারিস?”
আমি লগা ছেড়ে মাচানের দিকে আসি। ছোট ডিঙিনৌকা দুলে উঠে। আমি ওর শরীরকে ছঁুয়ে দেখি। আমায় জাপটে বসে থাকে মৌবনী। আমি ওর শিউলি বোঁটায় হাত রাখি। শিউলি কুঁড়িতে সবে গন্ধ দানা বেঁধেছে। আমি ঠোঁট রাখি শিউলি বোঁটায়। আমার ফোসকা-পড়া হাতের তালুতে কিছু পাপড়ি খসে পড়ছে। নৌকায় জল উঠছে দ্রুত। আমরা কি দু’জনেই ডুবে যাচ্ছি?
শিশিরের স্রোত নামছে মৌবনীর গা থেকে। বিন্দু-বিন্দু এই শিশিরধারা নদী হয়ে বইছে আমার হৃদয়ে। এই নদীপাড় জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে সেঁজুতির মতো যারা।

রিমির কথা

/

রিমির কথা

রাজশ্রী বসু অধিকারী


[ চিঠি-১ ]
 
প্রিয় মুনিয়া,
কাল একটা বড় চিঠি লিখেছিলাম তোকে। কিন্তু সেটা পোস্ট করা যায়নি। কারণ, সেই চিঠিটা ছিল মনে-মনে লেখা। তখন হঠাত্‌ সারাদিনের জমাট আকাশে অদ্ভুত এক সোনালি রং ধরেছিল। আমাদের ঘরে সর্বক্ষণ এসি চলতেই থাকে, তুই জানিস। তাই দরজা, জানালা সব বন্ধ। জানালার থ্রি-ফোর্থ কাঠ আর ওয়ান-ফোর্থ কাচ। সেই একটুকরো চৌকো কাচের মধ্যে দিয়ে বাইরের হলদে আকাশটা দেখে একছুটে চলে গেলাম ছাদে। আর ছাদে একটুখানি দঁাড়ানো মাত্র কাণ্ডটা ঘটল, যেটা ঘটবে বলে একটু আগেও আমার অনুমান পর্যন্ত ছিল না। আমি অবাক হলাম। খুব-খুব অবাক হলাম। তখন তোকেই চাইছিলাম পাশে। মনে হচ্ছিল, তোর গলা জড়িয়ে ধরে আমার দোলনাটায় বসে পুরো ব্যাপারটা অ্যাানালিসিস করি। কিন্তু এই বিশেষ-বিশেষ সময়গুলোতে তুই আমার থেকে কী বিচ্ছিরিরকম দূরেই যে থাকিস! আমার যত লাগামছাড়া স্বপ্ন, উদ্ভট প্ল্যানপ্রোগ্রাম আর আগডুম-বাগডুম চিন্তাভাবনা প্রকাশের একমাত্র জায়গা তো তুই। আমার এক এবং একমাত্র বন্ধু। আমার চেয়ে একটুখানি বড়, একটামাত্র দিদি, আমার কনফেশন বক্স, আমার ড্রিম বেলুন
ধুস! আমার ভাল লাগে না। কেমন মেকানিক্যাল না এই সাইটগুলো? আর বড্ড একঘেয়ে। সবাই-সবাইকে একসঙ্গে দিনরাত গুড মর্নিং, গুড ইভিনিং করে যাচ্ছে। একটা ছবি পোস্ট করা মাত্র যে যার মত দিতে শুরু করল। সে মতের মূল্য আমার কাছে থাক বা না থাক! তা ছাড়া, আমার মনের ভিতর কী হচ্ছে না হচ্ছে, তা আমি জনে-জনে জানাতে যাবই বা কেন? রিকোয়েস্ট করে কি বন্ধু হওয়া যায়? গভীর বন্ধুত্বের জন্য গভীর মন জানাজানি চাই কিনা বল? অবশ্য তোকে এসব বলাই বৃথা। তুই তো রীতিমতো এইসব সাইটের পোকা। হঁ্যা, একথা ঠিক যে, নানা জায়গার মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে গেলে সোশ্যাল নেটওয়র্কিং সাইট আদর্শ উপায়। কিন্তু আমার তো তুই ছাড়া আর কাউকেই দরকার নেই। আমি মন খুলতে পারি বা খুলতে চাই তো একমাত্র তোর কাছেই।
অনেক বাজে কথার ভিড়ে আমার আসল কথাটাই বলা হল না। নীচ থেকে মা ডাকাডাকি করছে। অধৈর্য হয়ে উপরে উঠে এলে আমার ভাগ্যে যা জুটবে বুঝতেই পারছিস। তাড়াতাড়ি বলে নিই,
তোকে আগেরদিন বলেছিলাম না, আমাদের ফিজ়িক্স ব্যাচে দুর্গাপুর থেকে নতুন আসা ছেলেটার কথা? সেই যে হলুদ টি শার্ট, ব্লু জিন্স, ডার্ক কমপ্লেকশন আর ব্রাইট আইজ় মনে পড়ছে? ক্যালরিমেট্রির একটা প্রবলেম কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না। আমার পাশেই বসেছিল ও। জাস্ট আমার খাতাটা টেনে নিয়ে সল্ভ করে ফিরিয়ে দিল। আমি তো ওর নাম জানি না। কিচ্ছু জানি না! যখন থ্যাংকস বলতে গেলাম, কেমন একরকম করে তাকিয়ে বলল, ‘‘এরকম সিলি মিসটেক করলে ডিস্ট্রিক্ট ফার্স্ট গার্লকে আর বিএসসি-তে ফার্স্টক্লাস পেতে হবে না।” আমার খুব রাগ হয়েছিল জানিস তো। একটা অঙ্কের বদলে একগাদা উপদেশ কার ভাল লাগে বল? তা ছাড়া, আমি তো ওর হেল্প চাইনি। সব বন্ধুদের সামনে প্রেস্টিজ পাংচার। কড়াগলায় কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, স্যার ঠিক তখনই ভিতরের ঘর থেকে চলে আসায় চেপে গেলাম।
পরে যখন ক্লাস শেষ হল, সকলে আমরা একসঙ্গে বাইরে রাখা চটির পাহাড় থেকে যে যারটা খঁুজে নিতে ব্যস্ত আর অকারণ হাসি হই-হল্লায় গেটের সামনের ছোট্ট গলিটা সরগরম, যখন দেওয়ালের গায়ে স্তূপাকার সাইকেলের গাদা থেকে একটা-একটা করে নিয়ে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে সব ছেলের দল, ওই ছেলেটা ঠিক আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলে কিনা, “রাগ হলে তা চেপে রাখা ভাল নয়।” কথাটা বলেই অন্যদিকে মুখ করে, যেন কিছুই হয়নি, এমনভাবে বেরিয়ে গেল, আমি কিছু বলারই সুযোগ পেলাম না। তো সেই ছেলেটা, যার নাম আমি এখনও পর্যন্ত জানি না, যার চেহারাটা দারুণ হলেও স্বভাবটা আমায় যথেষ্ট রাগিয়ে রেখেছে, সেদিন ছাদে দাঁড়িয়ে তাকে দেখলাম, আমাদের বাড়ির ঠিক সামনের রাস্তায় মোটরবাইকের উপর বসে থাকতে। আমি কীরকম চমকেছি ওকে দেখে, তা তুই বুঝতেই পারছিস। ও যেন আমার খোঁজে আমাদের বাড়ির দিকেই তাকিয়েছিল। আমাকে দেখেই একমুখ হেসে হাত নাড়ল। কী অসভ্য বল। কথা নেই, বার্তা নেই বাড়ির সামনে এসে হাত নাড়া! কিন্তু সত্যি কথা বলব,আমারও ওকে দেখে ভীষণ ভাল লাগছিল। লাল মোটরবাইকের উপর বসা, চেক টি শার্ট আর ফেড জিন্সে যেন রাজপুত্র। গায়ের রংটা যেন ওর গ্ল্যামার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফরসা হলে কখনও এত ভাল লাগত না। কিন্তু কেন যে ও আমার বাড়ির সামনে ওয়েট করছে, এটা আমি ঠিক বুঝলাম না। ভাবছিলাম, নেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসি। ঠিক তখনই দেখি, আমার গানেরদিদি গেট ঠেলে ঢুকছেন। কতদিন উনি দেরি করে আসেন। আমার এমন কপাল যে, ওঁকে সেদিনই ঘড়ি দেখে আসতে হল। তাই আমার আর বেরনো হল না।
golpo-prob-27-2-14
তুই কী ভাবছিস আমি জানি মুনিয়া। প্রথমে তো একচোট হাসছিস, তারপর দাঁতে ঠোঁট কেটে ভুরু কঁুচকে ভাবছিস, এটা কী এমন ঘটনা! একটা ছেলে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল, ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল, এর মধ্যে কোনও সাসপেন্স বা রোম্যান্স কিছুই তো নেই। এত গৌরচন্দ্রিকার কী ছিল! আমি মানছি যে, বলতে গেলে ঘটনাটা খুবই ছোট, কিন্তু এর মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। সেই যে ছোটবেলায় ঠামির কাছে শোনা গল্পটা, পক্ষীরাজের পিঠে চেপে রাজপুত্র এল, পিঠে বসিয়ে নিয়ে গেল রাজকন্যাকে। সেই গল্পটাই যেন আধুনিক রূপে থ্রিডি এফেক্ট নিয়ে ধাক্কা দিল ছাদের কারনিস বেয়ে আমার চোখে। আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। কেমন সে হাসিটা জানিস? ঠিক যেমন করে শরত্‌কালের ঝকঝকে নীল আকাশে ভেসে থাকে সাদা মেঘের গুচ্ছ। ওই হাসিটা ফ্রিজ শট হয়ে আটকে গেল আমার বুকের অ্যালবামে। ঠামির গল্পটার সঙ্গে শেষটা মিলল না গানের দিদির জন্যে। কিন্তু স্বপ্নটা যে বুকের ভিতরই থাকল, তাই না? তুই যদি ব্যাপারটা ঠিকমত না বুঝিস, তা হলে তোকে রবিঠাকুরের কবিতা পড়তে বলব। ওহ্ ভগবান, তুই তো আবার বাংলা পড়িসই না, ভালওবাসিস না। তোর এই একটা জিনিসই আমার খুব খারাপ লাগে, জানিস তো দিদি। এ মা, তোকে আবার ভুল করে ‘দিদি’ বলে ফেললাম। তুই খুব খুশি হয়ে গেলি তো? যাক, এবারের মতো না হয় খুশি করেই দিলাম। এখন যাই রে। মা চেিঁচয়ে গলা ফাটাচ্ছে। দেখি, আবার কী ফরমায়েস রয়েছে। টা টা।
তোর অনেক-অনেক আদরের
সন্টুনি মন্টুনি রিমি


[ চিঠি-২ ]

আমার সোনা মুন্নু দিভাই,
আমার উপর রাগ করেছিস তো? জানি করেছিস। কারণ, পরপর দু’দিন আমি তোর মেসেজের রিপ্লাই দিইনি। দিইনি মানে দিতে পারিনি। আমার মনের অবস্থা এমন হয়ে আছে যে, কারও সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে পারছি না ভাল করে। সবসময় শুধু টুকটুকির মুখটা আমার চোখে ভেসে উঠছে। টুকটুকি আর জাম্বো আমার চেয়ে মাত্র চার-পাঁচ বছরের ছোট, দু’টো ফুটফুটে সুন্দর ছেলেমেয়ে। ওরা আমাদের এই হাউসিংয়েই থাকত। অন্য দু’টো বিল্ডিংয়ে। তুই কাগজে নিশ্চয়ই পড়েছিস সব ঘটনা। সমস্ত নিউজ় চ্যানেলে তো আলোচনা আর ইন্টারভিউয়ের ঝড় চলছে। তিনদিন আগে ওরা দু’জন দুপুরবেলায় স্কুল থেকে ফিরে একসঙ্গে বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে ঝাঁপ দেয়। টুকটুকি তো স্পটেই শেষ। জাম্বোকেও হাসপাতাল পর্যন্ত নেওয়া যায়নি।
আমি ভাবতে পারছি না রে দিভাই। মাশরুম কাট চুল আর গোল ফরসা মুখের মিষ্টি মেয়েটা কী সুন্দর আবৃত্তি করত। হাউজিংয়ের যে কোনও ফাংশনে ওর আবৃত্তি ছিল মাস্ট। আর জাম্বো, একটা তেরো-চোদ্দ বছরের লাইভলি ছেলে। দুষ্টু আর মিষ্টি। ওদের দু’জনকে প্রায় সময় একসঙ্গেই দেখতাম। স্কুল, কোচিং, পার্ক, খেলার মাঠ অথবা সিনেমাহল। ছোট-ছোট দু’টো ছেলেমেয়ে, একসঙ্গে বড় হয়ে উঠছে, তারা একসঙ্গে হাঁটাচলা করবে, এরমধ্যে আমার চোখে তো কিছু আশ্চর্য লাগেনি। কিন্তু এভাবে এত তাড়াতাড়ি ওরা চলে যাবে সব ধরাছোঁয়ার বাইরে, এটা কী করে কেউ মেনে নেবে বল তো? আমাদের হাউসিংয়ের কেউই মেনে নিতে পারছে না। ওই দৃশ্যটা, উঃ! কী বীভত্‌স! যখনই একা হচ্ছি, সারা শরীর গুলিয়ে বমি আসছে। টুকটুকির শরীরটা পড়ে আছে রক্ত মাখা অবস্থায়। পাশে জাম্বোর থেঁতলে যাওয়া মুখ। উপরদিকে তুলে ধরা হাতে তখনও মুঠো করা একটা কাগজের টুকরো। তাতে কী ছিল বল তো? মাত্র চারটি শব্দ । উই আর ইন লাভ। একেই কি ভালবাসা বলে দিভাই? এইভাবে, নিজের উপর এত নিষ্ঠুর হয়ে উঠে অসময়ে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া? যদি ওরা ভালইবাসল, তা হলে বেঁচে না থেকে মরার রাস্তাটাই বেছে নিল কেন? সারাজীবনটা তো পড়েছিল। কী এমন তাড়া ওদের এভাবে ডেস্ট্রাকটিভ করে তুলল?
আমি তিনদিন ধরে খেতে পারছি না। পড়াশোনা তো সব শিকেয় উঠেছে। অনেক-অনেক কান্না আমার গলার কাছে জমাট বেঁধে আছে। অনেক প্রশ্নের ভিড়। শুনলাম, স্কুলে নাকি প্রিন্সিপাল ওদের মেলামেশা নিয়ে কিছু বকাবকি করেছিলেন। তার ফলেই এই দুর্ঘটনা। না, আমার যত কষ্টই হোক, আমি কিছুতেই টুকটুকি আর জাম্বোকে ক্ষমা করতে পারব না। ওরা শুধু নিজেদেরই শেষ করেনি, শেষ করে দিয়েছে ‘লাভ’ শব্দটার উপর আমার এ পর্যন্ত সমস্ত বিশ্বাস আর ভরসা। আমার মনের ভিতরে একটা লাল-নীল-গোলাপি রঙে ডোবানো, স্বপ্ন-কল্পনার বেলুন ছিল জানিস। হাওয়া দিলে সেটা নিজস্ব ভঙ্গিমায় এ দিক-ও দিক দুলত, আমাকে খঁুজে এনে দিত নাম না জানা রঙিন ফুলের পরাগ। যার গন্ধ আর ছোঁয়া আমাকে সারাক্ষণ ভরে রাখত অকারণ খুশি আনন্দে। সেই বেলুনটার গায়ে কে যেন মাখিয়ে দিয়েছে ছোপছোপ রক্ত। উঃ মাগো! এখন যে চোখ বুজলে কেবলই দেখতে পাচ্ছি রক্তে ভেসে যাওয়া টুকটুকি আর জাম্বোর মুখ।
golpo-27-2-14-new
কিন্তু যাক ওসব কথা, তোর কথা বল। তুই কেমন আছিস? নতুন জায়গায় গিয়ে কেমন লাগছে? ক’জন বন্ধু হল? কলেজটা কেমন? সব বল আমাকে। আমি এখন শুধু তোর কথা শুনব। মনে হচ্ছে, একছুটে এখান থেকে কোথাও চলে যাই। তোর মতো বাইরের কোনও কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেই পারতাম। কেন যে শুধু-শুধু এখানেই ফিজ়িক্স অনার্স নিতে গেলাম!
নাহ, আজ আর ভাল লাগছে না রে। মনটা কেমন যেন থেকে-থেকেই ফঁাকা মাঠের মতো লাগছে। কী যেন নেই, কী যেন নেই। তোকে সামনে পেলেও আজ বোধ হয় আর অনর্গল বকবক করা হত না। শুধু পাশাপাশি বসে থাকতাম ছাদের কোণে রাখা দোলনাটায়। চুপ করে তাকিয়ে দেখতাম, কেমন করে গাছের শরীর থেকে ডালপালার মৃদু কত্থকের মোহরা ধীরে-ধীরে ছড়িয়ে পড়ে ঝড়ের মতো হয়ে। কেমন করে একটু দূরের অন্ধকার মাঠ চিরে রেললাইন ধরে ছুটে যায় আলোর ঝিলিক তোলা হাওড়া-দিল্লি পুরুষোত্তম এক্সপ্রেস। আমি রোজ একা-একা ওই ট্রেনটা দেখি। আজ তোকে নিয়ে দেখতাম। কিন্তু তুই এখন কোথায়? কতদূরে? মাঝে-মাঝে ভাবি, আমরা দু’জন একসঙ্গে থাকতে পেলে কী মজাই হত। শুধু মজাই না আর যেটা হত সেটা হল, আমরা কেউই আর ফাইভ থেকে সিক্সেও উঠতে পারতাম না। এটা অবশ্য আমার নয়, মায়ের সংযোজন। উফ্, মায়ের কথা যদি লিখতে বসি তা হলে ‘ইলিয়াড’ হয়ে যাবে আর একটা! কত কী যে বলার আছে তোকে
তোর রিমি

[ চিঠি-৩ ]


দিভাই,
তুই আমাকে নিয়ে যা না রে। আমার আর ভাল লাগছে না এই কড়া শাসনের মধ্যে থাকতে। সারাক্ষণ বাপি, মা আর ঠামির টিকটিক-টিকটিক। এরা সকলে মিলে আমার জিনা হারাম করে তুলেছে রে। সবসময় শুধু রিমি-রিমি-রিমি। এটা কোরো না, ওটা কোরো না, মুখ এত গম্ভীর কেন, এত হাসার মতো কী ঘটেছে, অসহ্য। আমি যা করব তাই নিয়েই ওদের অনেক প্রশ্ন। একটা উত্তর দিতে যাও বলবে, কলেজে ভর্তি হয়েই মুখে-মুখে কথা বলতে শিখেছ? এই শিক্ষা হচ্ছে? উঃ! এদের সঙ্গে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করব ভেবে আমি মাঝে-মাঝে পাগল হয়ে যাই । তুই খুব বেঁচে গিয়েছিস রে। হস্টেল, ক্লাস, ক্যাম্পাস, বন্ধুরা
আমার তো আঠারো হতে আর দু’মাস মাত্র বাকি। কিন্তু ওরা আমাকে এমনভাবে ট্রিট করে যেন, আমার বয়স ছয় কী সাত! আমি যে বড় হয়েছি, আমারও যে নিজস্ব চিন্তাভাবনা, মতামত রয়েছে, আমি যে নিজের ভালমন্দ খেয়াল রাখতে শিখেছি, এগুলো ওরা কেন যে কিছুতেই মানতে চায় না! ওদের যে ভুল হতে পারে সেটা মানতেই চায় না।
এই যেমন সেদিনের একটা ছোট্ট ঘটনা, বাপির এক কলিগের বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে যেতে হবে। আমার তো যাওয়ার ইচ্ছেই ছিল না। ওই সময়টা বুকে বালিশ দিয়ে আয়েশ করে নেট ঘাঁটব ভাবছিলাম। ওঁদের সম্মিলিত আদেশ এবং অনুরোধে যাব বলে ঠিক করলাম। তারপরের চ্যাপটারটা ‘রিগার্ডিং ড্রেস’। আমি যেতে চাই জিন্স, টি শার্ট পরে, যাতে আমি সবচেয়ে কমর্ফটেব্ল। আর মা আমাকে একটা গর্জাস সালোয়ার কামিজ দিয়ে বলল, ‘‘এত টাকা দিয়ে সেজকাকু গিফট করেছে একদিনও পরা হয়নি, এটা পরে চলো।” চিন্তা কর, এই গরমের মধ্যে ওই জরি বসানো সালোয়ার, বাপ রে বাপ! আমায় কেন পরতে হবে, না সেজকাকু অনেক টাকা দিয়ে কিনেছেন, না পরলে দুঃখ পাবেন। কেন কিনেছেন? আমি কি ওঁকে বলেছিলাম? আমায় জিজ্ঞেস করলে অনেক কম খরচে হয়ে যেত। আমার সুবিধে-অসুবিধেটা কোনও ম্যাটার করে না। কিছু বললেই শুনতে হবে, মানুষের সেন্টিমেন্টের দাম দিতে শেখনি! আমাকে সবার ফিলিংসটা বুঝতে হবে আর আমারটা?
যাক গে, আমার দুঃখের ঝুড়ি তোর কাছে যদি এখন উপুড় করতে বসি তা হলে তুই বোর হবি। তার চেয়ে তোর কথা শুনি!
তোর ক্লাস কেমন চলছে? পড়াশোনা করছিস? নাকি শুধুই আড্ডা? তোর সেই নতুন বয়ফ্রেন্ড? আরিয়ান না কী যেন নাম বলেছিলি সেদিন? ওর সঙ্গে আর কোথাও গিয়েছিলি নাকি?
তোর কিন্তু খুব সাহস আছে বলতেই হবে। এটা আমি ছোটবেলা থেকেই অ্যাডমিট করে এসেছি বল? সত্যি, আমার মতো ফ্যান তুই একটাও পাবি না। ঝটতি ডিসিশন নিতে, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে তোর মতো আর কেউ পারে না। আমি তো পারিই না।
যদি পারতাম তা হলে আমিও আজ তোর মতোই দিল্লি বা বেঙ্গালুরুতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে যেতাম। বাপি আর মায়ের মনখারাপ-মনখারাপ মুখ দেখে এই পুরুলিয়াতেই ফিজ়িক্স অনার্স নিয়ে অ্যাডমিশন নিতাম না। আমার রেজ়াল্টও তো কত ভাল ছিল বল।
তবে আমি সবসময়েই ভাবতে চেষ্টা করি যা হয়েছে ভাল হয়েছে। এখান থেকেই আমি স্ট্যান্ড করব। ঠিকঠাক পড়াশোনা করলে জায়গাটা কোনও ম্যাটার না। এই তো সেদিনই পুরুলিয়ার
মেয়ে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে। আমিও পারব। এখান থেকেই আইএএস পরীক্ষা দেব ভাবি রে। কিন্তু মাঝে-মাঝে মনটা বড্ড ভেঙে যায় যখন ভাবি, তোরা সকলে কী আনন্দে জীবন কাটাচ্ছিস। আমার ক্লাসমেটদের অনেকেই চলে গিয়েছে কলকাতা, দিল্লি, বেনারস, চেন্নাই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলে শুনতে পাই নিত্যনতুন অ্যাডভেঞ্চারের গল্প। ঝাঁ চকচকে শহর, ভীষণ সুন্দর সাজানো-গোছানো ক্যাম্পাস আর আলোর গতিতে ছুটে চলা দিনরাতের আকর্ষণ তো আছেই, তাই না?
যখন কলেজ শেষে বাড়ি ফিরে, শেষ বিকেলের মুখে ছাদে বসি একটু রিল্যাক্স করতে, আমার চারপাশের ঘন গাছপালার ডাল থেকে ভেসে আসে ঘরে ফেরা পাখিদের অবিশ্রান্ত কিচিরমিচির। দূরে মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়া রেললাইনে ভেসে যায় পুরুলিয়া-ঝালদা ইএমইউ কোচের ঝমঝম গান। আমার ভীষণ একা লাগে। একটু-একটু করে সন্ধে নেমে আসে। একটু-একটু করে আমি একা হয়ে যাওয়া অভিমানী মনটাকে অনেক আদর করে ফিরিয়ে আনি চেনা শহরের ঘেরাটোপে। বড় যত্নে ধরে থাকতে হয় মনের লাগাম। না হলে ও কেবলই ছুটে পালাতে চায় দুর্বার গতিতে।
নাহ! এবার রেখে দিচ্ছি। বড্ড বেশি সেন্টু হয়ে পড়ছি। প্লিজ়, প্লিজ়, প্লিজ় এটা কাউকে বলিস না, এমনকী, তোর বয়ফ্রেন্ডকেও না, ওকে?
তোর রিমি
golpo-prob-27-2-14
[ চিঠি-৪ ]

মুনিয়াপাখি,
বেশ ক’দিন পর বসলাম তোর সঙ্গে কথা বলতে। এই ক’দিন ব্যস্ত ছিলাম ফার্স্ট ইয়ারের অ্যানুয়াল পরীক্ষার প্রিপারেশন নিয়ে। অনেকগুলো এক্সট্রা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসও হল লাস্ট উইকে। আমাদের কলেজটার গ্ল্যামার নেই কিন্তু পড়াশোনা খুব ভাল হয় রে। র্যাগিং বা ইউনিয়নের দাদাগিরি নেই বললেই চলে। রেগুলার ক্লাস হয়। স্যারেরা যত্ন করে পড়ান। কোনও একটা সাবজেক্টের ভিতরে ঢুকে গেলে আর বাইরের গ্ল্যামারটা বিশেষ ম্যাটার করে না। দিন পনেরো ধরে দেখছি, আমার মধ্যে বড় শহরের বড় কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ার হা-হুতাশটা কমে এসেছে। এই প্লাস্টারচটা দেওয়ালে ঘেরা ফুটিফাটা বিল্ডিংটার উপরে কেমন একটা ভালবাসা চলে আসছে। আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি, এই কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়েই আমি একে এনে দেব প্রথম আইএএস ছাত্রী তৈরির সম্মান। হাসছিস? হেসে নে, হেসে নে। পরে কিন্তু তোকে বলতেই হবে, ‘রিমিসোনা হ্যাটস অফ’। আমার জেদ তো জানিস।
পরীক্ষার বেশ কিছু দেরি আছে। আমাকে যেহেতু রেজ়াল্টা খুব ভাল করতেই হবে, তাই জোরকদমে ফাইট শুরু করে দিয়েছি। আজ সন্ধেবেলায় হঠাত্‌ জোরে হাওয়া দিল একটা। ধুলোয় ঢেকে গেল চারদিক। ঝপ করে লোডশেডিং হল। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে। আমার মন একছুটে পুরুলিয়া থেকে সেই বহুদূর দিল্লি, যেখানে তুই ম্যানেজমেন্টের ক্লাস থেকে ফিরে হয়তো কোনও আড্ডায় অথবা আমার মতোই খাতাপত্রের ভিড়ে মুখ গুঁজে আছিস। ওহ সরি, তুই তো আবার নোট লেখালেখির পাটই তুলে দিয়েছিস প্রায়, এখন প্রায় পুরোটাই কম্পিউটারে সারছিস। আমার কিন্তু হাতে লিখতে ভাল লাগে খুব। ভাল লাগে পড়ার ফাঁকে আনমনে খাতার পিছনে আঁকিবুকি কাটতে। আমি একটু ব্যাকডেটেড বোধ হয়, বল? আমি এরকমই থাকতে চাই। কঠিন যান্ত্রিক আবরণে জীবনকে ঢেকে ফেলতে আমার মন সায় দেয় না। আমি চাই আধুনিক যুগোপযোগী উপকরণের পাশাপাশি নরম কোমল হৃদয়ের ছোঁয়া, যেখানে আবেগ আছে, আছে আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এই এক দোষ হয়েছে আমার। তোর সঙ্গে কথা বলতে বসলে কিছুতেই নির্দিষ্ট জায়গায় থেমে থাকতে পারি না। যা বলব বলে ঠিক করি, কেবলই তার থেকে এদিক-সেদিক ঘুরে-ঘুরে বেড়ায় আমার কলম।
তো, যা বলছিলাম, যেই লোডশেডিং হল, আমার আর পড়তে ভাল লাগল না। মাকে এককাপ কফি করতে বলে দোতলায় কোণের ঘরের লাগোয়া বারান্দায় চলে এলাম। আমি দুলতে ভালবাসি বলে বাপি এখানে একটা রকিং চেয়ার এনে রেখেছ। আমার লাস্ট বার্থডের গিফট। ছাদের দোলনাটার মতো এটাও আমার একটা প্রিয় জায়গা।
চারদিক অন্ধকার। সামনের রাস্তার আলোগুলো তো কবে থেকেই ভ্যানিশ! শুধু ছুটে যাওয়া বাইকের হেডলাইট আর রিকশার টুংটাং। সেইসঙ্গে ভেসে আসছিল গেটের পাশে লতিয়ে ওঠা হাসনুহানার গন্ধ। সামনের সেই অন্ধকার ভাসা রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে আমার মনে পড়ে গেল সেই ছেলেটাকে! যার কথা তোকে বলেছিলাম। সেই দুর্গাপুর থেকে আসা নতুন ছেলেটা। ওর নামটা জেনেছি এর মধ্যে। ভারী সুন্দর নাম! স্বপ্নিল মুখোপাধ্যায়। আমার ব্যাচমেট দীপাবলি আছে না, ও-ই বলছিল। ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছে ছেলেটির। দুর্গাপুরেই পড়ে, হস্টেলে থাকে। এখানে মামারবাড়ি এসেছে কয়েকদিনের জন্য। স্যারের কীরকম রিলেটিভ হয়, তাই ব্যাচে জয়েন করেছে টেম্পোরারিলি। ছেলেটা আর কয়েকদিন পড়তে এল। আমার সঙ্গে আর একটাও কথা হয়নি। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, ও আমাকে দেখছে। ভাবলাম জিজ্ঞেসা করি, সেদিন কেন এসেছিল ও? কেন ওয়েট করছিল রাস্তায়? কিন্তু তুই তো জানিসই আমি আগ বাড়িয়ে কথা বলতেই পারি না। অনেকে ভাবে, এটা আমার ইগো। কিন্তু আমি জানি না, এটা আমার দুর্বলতা কি না!
অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে হঠাত্‌ আমার মনে হল, ও যদি আমার বয়ফ্রেন্ড হত! আমি তো প্রায় কোনও ছেলের সঙ্গেই সেভাবে মিশিনি। কাউকে তেমন ভালও লাগেনি। কিন্তু এই ছেলেটার মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। স্পেশ্যালি দোজ ব্রাইট আইজ! মিথ্যে বলব না, তোর কাছে তোর বয়ফ্রেন্ডদের গল্প শুনে, মাঝে-মাঝে আমার খুব হিংসে হত। এখন ভাবছি, ও আমাকে প্রপোজ় করলে আমি অ্যাকসেপ্ট করব। মনে হল, এই স্বপ্নিল নামের ছেলেটা এক্কেবারে আমার স্বপ্নের সঙ্গে পারফেক্ট ম্যাচিং। ওর হাইট, কমপ্লেকশন, লুকস, জেসচার, সব সব
যখনই ভাবলাম, তখনই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলা লাল মোটরবাইকের উপরে এক জাদুসওয়ারি। তার কোমর জাপটে ধরে, কাঁধে মুখ গুঁজে বসে আছে ওই মেয়েটা কে? যার কাঁধ পর্যন্ত খোলা চুল হাওয়ায় উড়ছে, যার শরীর লেপটে আছে ওই জাদুসওয়ারির পিঠে।
কতক্ষণ আমি যেন বঁুদ হয়ে বসেছিলাম। শুধু একটা দৃশ্যই এত নেশা ধরায় শরীরে? মনে? আমার জানা ছিল না রে! ভীষণ-ভীষণ ভাল লাগছিল আমার। ঠিক এমন সময়েই বেশ জোরে মায়ের গলা শুনে ফিরে এলাম বারান্দায়, আমার স্বপ্নের রাইড থেকে।
কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে মা বলল, “কী রে? কী এত ভাবছিস এত মন দিয়ে? মন্নুর কথা?’’
মা জানে আমার ভাবনা, চিন্তা, ভাব, ঝগড়া সব তোকে ঘিরেই। মায়ের কোমরের কাছে মুখটা গুঁজে দিয়ে শুধু বললাম, ‘‘হুঁ।’’ আমি মাকে এই প্রথম সত্যি কথাটা বলতে পারলাম না রে। আমার মনে হল, সত্যি-সত্যি আমি অ-নে-ক-টা বড় হয়ে গিয়েছি!
অনেক রাত হল, গুডনাইট।
তোর আদরের বোন রিমি

[ চিঠি-৫ ]

golpo-prob-27-2-14-new2
দিভাই,
এখন অনেক রাত। সীমাহীন নৈঃশব্দ দু’চোখে মাখানো। কখনও আলোকবিন্দু ছিল এই পথে। মুছে গিয়েছে কলরব, সব আলো নিয়ে।
আমার কথাগুলো কেমন কবিতার মতো শোনাচ্ছে, তাই না রে দিভাই? কী আশ্চর্য দেখ, আমি কিন্তু কবিতা লিখব বলে লিখিনি। শুধু তোর কাছে উজাড় করে দিতে চেয়েছিলাম আমার মনের যত ব্যথা, কষ্ট, কান্না। যা আর কাউকে বলতে পারা যায় না, আমার সেইসব অজস্র কথার ভার তো চিরকালই তোর উপরেই চাপিয়ে এসেছি। আমার যত দম বন্ধ করা দুপুর, ঝড় তোলা সন্ধে আর মায়াবী আলোর বিকেল, আমার যত শব্দসমুদ্র সবকিছুর একমাত্র সঙ্গী তো তুই-ই। মাঝরাতে না ঘুমানো চোখের কোণে জলের ফোঁটাও একমাত্র তোকেই দেখানো যায়।
সেই চোখের জলের ফোঁটাগুলো একটা-একটা করে জমে কেমন সুন্দর কবিতা হয়ে গেল। পৃথিবীর যত কবিতা বুঝি এভাবেই লেখা হয়? একটু-একটু করে কান্না জমিয়ে?
আমি জানি তুই কাছে থাকলে এখন কী জিজ্ঞাসা করতিস। জানি তো তুই আমার কষ্ট একটুও দেখতে পারিস না। চুল ঝাঁকিয়ে বলতিস, “ওহ হো রিমি, প্লিজ় এত ভণিতা রাখ, আসল কথায় আয়।” আমার দু’কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে চেঁচাতিস, “কী হয়েছে?”
কিন্তু মূল কথায় আসার আগেই কোনও-কোনও চ্যাপ্টার ইনট্রোতেই শেষ হয়ে যায়। মানে তারপরেরটা আর লেখাই হল না! ঠিক আমার সঙ্গে যেমন হল। লেখার মতো খুব কিছু মেটেরিয়াল নেই। ছোট্ট একটা ঘটনা, শুধু যার ইমপ্যাক্ট আমি সাতদিন পরও ভুলতে পারছি না। কে যেন ভীষণরকমভাবে আমাকে ঠকিয়েছে।
গত শনিবার ব্যাচের পড়া শেষ করে যখন গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি রিক্সা ধরব বলে, স্বপ্নিল আমার দিকে এগিয়ে এল। ওর খাতার ভিতর থেকে একটা কার্ড আর একটা গোপাল বের করে আমায় দিল। তোকে তো আগেই বলেছিলাম, ও প্রপোজ করলে আমি অ্যাকসেপ্ট করব। এর জন্য ভিতরে-ভিতরে আমি অপেক্ষাতেও ছিলাম। একটা সুন্দর ছেলে, ঝকঝকে, স্মার্ট আর রঙিন গোলাপ। কী মিষ্টি একটা মোমেন্ট বল? কেমন অবশ করা ভাল লাগায় ভরে গিয়ে হাত বাড়ালাম। সেদিন বাড়ি ফিরেই তোকে জানাতাম কিন্তু বুল্টিপিসিরা বেড়াতে আসায় আর সময় পাইনি। পরদিন সকালেও ফিজ়িক্স কোচিং ছিল। আমি বাপিকে লুকিয়ে টব থেকে একটা হলুদ গোলাপ তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম ওর জন্য। যত্ন করে খামে বন্ধ করে রেখে দিয়েছিলাম ব্যাগের সাইড পকেটে। পড়ার শেষে বাইরে বেরিয়ে দেব। আমার কল্পনার রাজপুত্র, উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে হাত পেতে নেবে আমার প্রথম উপহার। অপেক্ষা করছিলাম কখন পড়া শেষ হবে আর গলির মুখটায় গিয়ে দাঁড়াব। ও নিশ্চয়ই চলে যাবে না। নিশ্চয়ই বুঝবে যে, আমি অপেক্ষা করছি ওর জন্য। আমারও কিছু দেওয়ার আছে ওকে।
কিন্তু সেই মুহূর্তটা আর এল না রে!
আমাদের পড়ার মাঝখানেই বাইরে একটা পুলিশজিপ এসে দাঁড়াল। পাঁচ-ছ’জন পুলিশ আচমকা ঘরের মধ্যে ঢুকল। একজন খপ করে ওর জামার কলার ধরে টেনে তুলল। স্যার ধমকে উঠেছিলেন,“এ কী! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ওকে? কী করেছে ও?’’ আমরা সবাই হতবাক। আমার তখনকার মনের অবস্থা তুই বুঝতে পারছিস? একজন পুলিশ স্যারের চেয়েও উঁচু গলায় চেিঁচয়ে উঠল, “কী করেছে? জিজ্ঞেস করুন আপনার ছাত্রকে।’’ কথা বলার ফাঁকে-ফাঁকে স্বপ্নিলের চুলের মুঠি ধরে নাড়িয়ে দিচ্ছিল পুলিশের লোকটি। কী কদর্য সেই ভঙ্গি! আমার বুকের ভিতর তখন লক্ষ কাচের ঝাড়বাতি ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। চোখের সামনে আমার স্বপ্নের রাজপুত্রের এই অবমননা! এ যে কী কষ্ট, কী কষ্ট!
দিভাই, সবচেয়ে আশ্চর্যের এই যে, স্বপ্নিল একবারের জন্যও বলল না, আমি কিছু করিনি, আমায় ছেড়ে দিন। যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছে, এমন মুখ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। আমারা সবাই পুলিশের মুখে শুনলাম, ও বর্ধমানের কোনও সেন্টার থেকে অন্য একজনের হয়ে জয়েন্ট এন্ট্রাস পরীক্ষায় বসেছিল। টাকা নিয়ে এই কাজ করেছে। সেই ছেলেটি চান্সও পেয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। অ্যাডমিশনের সময় পুরো ব্যাপারটা ধরা পড়ে যায়। স্বপ্নিলের নাম ওর কাছ থেকেই পাওয়া গিয়েছে। ওদের দু’জনের নামে কেস হওয়ায় গা ঢাকা দিতে স্বপ্নিল পুরুলিয়া এসেছিল। কিন্তু পুলিশের চোখে ফাঁকি দেওয়া যায় না। আমাদের সকলের চোখের সামনে পুলিশ ওকে মারতে-মারতে জিপে তুলল।
স্যারের খুব পছন্দের ছিল রে ছেলেটি। খুব ব্রাইট। স্যার তারপর আর পড়াতে পারলেন না সেদিন। এই সাতদিনের মধ্যে আর পড়িয়েছেন কি না তাও জানি না। আমি তো আর যেতেও পারিনি। রবিবার দুপুর থেকে জ্বর এল। আজই একটু ভাত খেয়েছি।
সেদিন কী করে বাড়ি ফিরেছিলাম মনে নেই। ব্যাগের ভিতর হলুদ গোলাপটা যেন তার সমস্ত কাঁটা নিয়ে আমাকে নিঃশব্দে বিঁধে যাচ্ছে। পুরো রাস্তাটায় পারিনি, বাড়ি ফিরে এসেও আমি গোলাপটা ফেলে দিতে পারলাম না। ওর দেওয়া কার্ডটার ভিতরে, ওরই দেওয়া গোলাপটা আমার বইয়ের র্যাকের একদম তলায় রেখে দিয়েছি।
প্রায় মাঝরাত। মাথাটা বড্ড ব্যথা করছে। এবার শুয়ে পড়ি?
তোরই রিমি।

এনবি- ভাবছি, এবার থেকে ফিজ়িক্স বইয়ের বাইরে আর তাকাব না রে। ছাদের কারনিসেও আর ঝঁুকব না। আমাকে তো আইএএস হতে হবে, তাই না?