News Ticker

Menu

Browsing "Older Posts"

Browsing Category " Story "

শিউলি

Monday, May 18, 2015 /

শিউলি

দীপাঞ্জন বিশ্বাস


নারকেল পাতা থেকে টিনের চালে টুপটুপ শিশির পড়ে। দোতলা থেকে শিউলি গাছটার আবছা জেগে থাকা দেখা যায়। পাশের পাড়ার পুজো প্যান্ডেলে মহালয়ার পর থেকেই ভোররাতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ বাজে। সামনেই প্রথম সেমেস্টার, ভোররাতে মা ডেকে দেয় পড়ার জন্য।
বিদ্যুত্‌হীন গ্রামগুলোয় সন্ধ্যা ঘনায় দ্রুত। আমায় ডেকে দিয়ে কেরোসিন বাতি নিয়ে ঢেঁকিঘরে ধান ভানে মা। ভোররাতে এই ঢেঁকির শব্দ, রাতের হৃদ্স্পন্দন মনে হয়। শিউলি খসা শুরু হয় আর একটু পরে।
মহালয়ার পর থেকেই প্রতীক্ষা শুরু হয়। চোখ চেয়ে থাকে। শিশিরের শব্দ ভেঙে শিউলি গাছের নীচে এসে বসবে দু’টি রাঙা পা নিয়ে মৌবনী। আঁধার পায়ে, চুপিচুপি মৌবনী এসে বসে শিউলিতলায়। হৃদ্স্পন্দন দ্বিগুণ হয়ে যায়। মৌবনীর হাতে ভেঙে যায় শিউলির লজ্জা। নরম হাত খঁুটে নেয় সাদা ফুল। সাজিতে তুলে রাখে। কাঁপা-কাঁপা চোখে চেয়ে থাকি। আমার আলোজ্বলা দোতলার জানলায় চোখ রাখে মৌবনী। চুরি করে দেখে নেয় আমায়। আমি দেখি না, অথবা দেখি অন্ধ শরীর।
আমি শব্দ করে পড়ি। আঁচল ভরে উঠলে ফুলে, উঠে যায় চুপিসারে। মা অন্ধকারে দেখে নেয় মৌবনীর উঠে যাওয়া। ঢেঁকিঘর পেরোতেই মা ডেকে উঠে, ‘‘মৌ কবে এলি?”
“কাল সন্ধে ছ’টায়।”
মৌবনী মায়ের কাছে গিয়ে বসে, আমি পড়া থামিয়ে দিই। মা ঢেঁকির তালে-তালে, মৌবনীকে প্রশ্ন করে চলে। মৌ উত্তর দেয়। দুটো ঢেঁকির শব্দের মাঝে কথাগুলো চেপে আমার কানে আসে।
মা চিত্‌কার করে বলে,‘‘নীল ঘুমিয়ে পড়লি?”
মা এত শব্দের মাঝেও কী করে বোঝে আমি পড়া থামিয়েছি! আবার শব্দ করে পড়তে শুরু করি।
সারা বছর অপেক্ষায় থাকি পুজোর ক’টা দিনের জন্য। এই সময় মামার বাড়ি আসে মৌবনী। দু’ হাতে শিউলি কুড়োয়। সবাই জেগে ওঠার আগে, আমি শিউলিতলায় মৌবনীর পায়ের পাতার দাগগুলো অনুভব করি। দু’ হাত থেকে শিউলি ফুলের উপর ঝরে পড়া আদর, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে সারা শিউলিতলা।
মা সকালে গোবর দিয়ে শিউলিতলা লেপে দেয়। মৌয়ের ছোঁয়া আমাদের আঙিনা থেকে সেদিনের মতো মুছে যায়। শুনেছি, মৌবনীর মায়ের সঙ্গে আমার বাবার প্রেম ছিল। পাড়ায় বিয়ে দিতে রাজি হয়নি ঠাকুরদাদা। দুই পরিবারের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ছিল অনেকদিন। দূর গাঁয়ে মৌবনীর মাকে বিয়ে দিয়েছিল। তাই মৌবনীরা মামাবাড়ি খুব কমই আসত।
হস্টেল থেকে বাড়ি ফিরে ক’টা দিন বাবার শাসনে আর মায়ের আদরে কাটে। পড়া শেষ হলে মা নাড়ু, মোয়া খেতে দেয়।
শেষ আশ্বিনের নদীপাড় জুড়ে কাশ আর হোগলায় মাখামাখি। বড় কাশ ফুলগুলো যেন সমুদ্র ফেনার মতো ছড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতিময়। একমুখী প্রবাহ ছেড়ে নদী ফেরে জোয়ারভাটায়। হৃদয়টাও একমুখী প্রবাহ ছেড়ে ফিরে আসে।
বেলা বাড়লে বাবা মাঠে ডেকে নিয়ে যায়। বাবার সঙ্গে কড়াইশুঁটি ক্ষেতে চাষ করি। দৈর্ঘ্য চাষ, প্রস্থ চাষ, লাঙলফলা বেঁকে যায়। বাবা ধমক দেয়, হাত পেকে ওঠে আমার। বলদের লেজে হাত দিলে অদ্ভুত সব শব্দ বেরোয়। পোষমানা গরুগুলো বাবার কথা বোঝে। আমার শব্দ ওদের কাছে বড্ড অচেনা, তবু বলদ দুটো হেলেদুলে হেঁটে যায়। শক্ত মাটির ঢেলাগুলো পায়ে লাগে, ব্যথায় ককিয়ে ওঠে। আর বুক ভরে নিই মাটিচেরা উষ্ণঘ্রাণ। বুঝি, এখানেই নবজাতক আসবে ক’দিন পর। এটা তারই প্রস্তুতি। তবে বাবাও ‘দাই’। আমিও কি?
রোদ ওঠে। মাঠ থেকে দেখা যায় রাস্তা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মৌবনী লাঙল দিয়ে আমার মাটি চষা দেখে। মাঠ পিষে যায় দুটো জোয়ালের শরীরে। মৌবনীর শরীরে শিহরণ জাগে। হলুদ পাখির মতো নেচে ওঠে মৌবনী। আমি রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি। চাষের লাইন বেঁকে যায়। ঢেলাগুলো পায়ে এসে আরও জোরে লাগে। শিশিরভেজা মাটি পা মুড়ে দেয়। ডান হাত, বাঁ হাতে ঘোরে লাঙলের গুটি। বাবা কোদাল দিয়ে আল কাটে।
সাদা মেঘ ভাসে আকাশে। তুলোর মতো নরম-নরম। লাঙলের সঙ্গে হাতের ঘর্ষণে আমার হাতে ফোসকা পড়ে। তরঙ্গের মতো সারা মাঠে ছড়িয়ে পড়ে লাঙলের চাষ। মাথায় কম্পাঙ্ক, দোলনকাল ঘোরে। ক্লাসের সেরা সেঁজুতি, দোলন কালের অনাবিষ্কৃত সূত্র বোঝায় আমায় একা পেলে, প্র্যাক্টিকাল রুমে, চোখ ও ঠোঁটের ভাষায়। বলদের পায়ে কোনও ব্যাস বা ব্যাসার্ধ থাকে না, গরু দুটো সমান্তরালে এগিয়ে যায়। হিসেব মিলে যায় সহজে।
আর আমি গুলিয়ে ফেলি, এই দুপুর রোদের সঙ্গে সেঁজুতিদের এসি গাড়িতে সুখকর যাপন, স্ট্রেট ভেলোসিটি, রোটেশন-মোশন ও দোলন কালের। চাষ এলোমেলো হয়ে যায় মৌবনী ও সেঁজুতির মাঝখানে। বাবা অশ্লীল ভাষায় নিজেকেই গাল পাড়ে, “নবাবজাদা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের খরচ কোথা থেকে আসে একটু বোঝার চেষ্টা করো, হালটা তো ঠিক করে ধরতে শেখো।”
মৌবনী বিকেলে আমাদের বাড়িতে আসে, আমার পড়ার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ায়। আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “চলো নীলদা, আমাদের বিলের ধার থেকে ঘুরে আসি।”
আমি বলি, “তুই মাকে বল।’’
ও মায়ের কাছে যায়। মাকে বুঝিয়ে রাজি করায়। মা বলে, সন্ধের মধ্যে ফিরে আসিস। মায়ের মনে কি ভয় কাজ করে?
মৌবনী আমাকে টেনে তোলে পড়ার টেব্ল থেকে। দু’জনে হাঁটি। হাঁটতে-হাঁটতে ও আমায় বলে, “আমি কিন্তু কাদা মাখতে পারব না। তুই আমায় কোলে করে নৌকায় তুলে দিবি। বলিস না, লোক দেখবে।’’
বিলের কাছে এলে ওকে কোলে করে নৌকায় তুলে দিই। ও মাচানে বসে থাকে। আমি নৌকা এগিয়ে নিয়ে যাই। মৌবনী জল ছিটিয়ে দেয় আমায়। আমি কোনও কথা বলি না। জানি, বললেও শুনবে না। আমি ওকে সেঁজুতির গল্প বলি।
ও বলে, “ওকে আমি দেখে নেব।”
“আমি তোর কে? যে, আমার জন্য তুই ওকে দেখে নিবি?’’
“তুই শুধুই আমার। এখানে কেউ হাত দিলে, আমি গলায় দড়ি দেব।”
“তুই কী করে জানলি, আমি তোর?”
“ভোরে আমি যখন শিউলি কুড়োতে আসি, তুই পড়া বন্ধ করে তাকিয়ে থাকিস।”
“তুই কী করে বুঝিস?”
“আরে বোকা, তুই তো আলোয় থাকিস, আমি অন্ধকারে। যারা আলোয় থাকে, তাদের তো দেখা যাবেই।”
আমার হাসি পায়। হাতের ফোসকাগুলোয় চাপ লাগে, ব্যথায় ককিয়ে উঠি। মৌবনী বুঝতে পারে।
“নীলদা, তুই লাঙল চালাস কেন, হাতে ফোসকা পড়ে। তুই পারিস এসব?”
“বাবা সারাবছর মাঠে খাটে। আমি এই ক’টা দিন বাবাকে একটু সাহায্য করি। হাড়ভাঙা খেটে বাবা শহরে টাকা পাঠায়, মাও কষ্ট করে।”
“তুই যখন বড় ইঞ্জিনিয়ার হবি, তখন তো এদেরই অনেক সুখ হবে।’’
“জানি না রে!”

পুকুরপাড়ে নৌকা ভেড়াই। দু’জনে নেমে যাই। পুকুরের পাড় জুড়ে পেঁপে, কলা, সুপারি, কয়েকটা আম-জাম গাছ।
হালকা উত্তুরে হাওয়ায়, মৌবনীর গা থেকে বীজতলার গন্ধ ভেসে আসছে। আমি ভাবছি, প্রত্যেক নারী একটা বীজতলা। এখানেই ফসল ফলে আর সেই ফসল আমরা কেটে নিই। সবুজ চুড়িদারে মৌবনীকে একটা শিউলি গাছ মনে হয়।
আমি মৌবনীর চোখে তাকিয়ে বললাম, “আমি তোর শিউলি ফুল দেখব।”
ও বলল, “বোকা, এই বিকেলে কি শিউলি ফোটে? ওটা রাতের ফুল, সূর্য দেখলেই ঝরে যায়।”
“তা হলে হাসনুহানা, গোলাপ, জবা, যা কিছু একটা দেখা।”
আমায় বলল, “আমার চোখের দিকে তাকা, এটা পদ্মকলি। ঠোঁটের দিকে তাকা, এটা গোলাপ পাপড়ি।” পাপড়ির আঘাত দেবে বলেই ওর ঠোঁট আমার ঠোঁটকে জাপটে ধরে। আমার ঠোঁট ভিজে যাচ্ছে গোলাপ জলে।

সন্ধ্যা নামলে আমি আর মৌবনী নৌকায় উঠি। বাড়ি ফেরার সময় মৌবনী বলল, “নীলদা, তুই এই অন্ধকার ভেদ করতে পারিস?”
আমি লগা ছেড়ে মাচানের দিকে আসি। ছোট ডিঙিনৌকা দুলে উঠে। আমি ওর শরীরকে ছঁুয়ে দেখি। আমায় জাপটে বসে থাকে মৌবনী। আমি ওর শিউলি বোঁটায় হাত রাখি। শিউলি কুঁড়িতে সবে গন্ধ দানা বেঁধেছে। আমি ঠোঁট রাখি শিউলি বোঁটায়। আমার ফোসকা-পড়া হাতের তালুতে কিছু পাপড়ি খসে পড়ছে। নৌকায় জল উঠছে দ্রুত। আমরা কি দু’জনেই ডুবে যাচ্ছি?
শিশিরের স্রোত নামছে মৌবনীর গা থেকে। বিন্দু-বিন্দু এই শিশিরধারা নদী হয়ে বইছে আমার হৃদয়ে। এই নদীপাড় জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে সেঁজুতির মতো যারা।

হীরের আংটি

/
হীরের আংটি
নীহাররঞ্জন গুপ্ত

সকালবেলা সবে দ্বিতীয় কাপ চা নিয়ে বিরূপাক্ষ একটি চার্মিনার ধরিয়েছে, সিঁড়িতে হালকা পায়ের জুতোর শব্দ কানে এল।

বিরূপাক্ষ বুঝতে পারে, আগন্তুক আর কেউ নয়, মিতুলবাবু। বিরূপাক্ষ চায়ের কাপে চুমুক দিতে ভুলে যায়, দরজাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েক মুহূর্ত পরে মিতুলবাবুকে ঘরে ঢুকতে দেখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,“কী সংবাদ মিতুলবাবু, আজ তো বুধবার, তোমার স্কুল নেই?”
মিতুল সামনের সোফাটায় বসতে বসতে বললে,“স্কুলে আজ আর যাওয়া হল না, বিরূকাকু।”
“কেন?”
“একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটে গিয়েছে।”
“বিশ্রী ব্যাপার!”
“হঁ্যা, আমার ছোটকাকুর হীরের আংটিটা সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
“হীরের আংটি! তা আংটিটা ছিল কোথায়?”
“ছোটকাকুর ডান হাতের আঙুলে। আংটিটা ঢিলে নয় যে আঙুল থেকে পড়ে যাবে কোথাও। বেশ টাইট ছিল আংটিটা।”
“হয়ত মনের ভুলে কোথাও খুলে রেখে  দিয়েছেন।”
“না।”
“তবে তোমার কী মনে হয়?”
“কেউ সরিয়েছে আংটিটা। বাড়িতে একটা নতুন চাকর এসেছে, মনে হচ্ছে এ তারই কাজ। আমি হলফ করে বলতে পারি, এ ঠিক কেষ্টার কাজ।”
“কতদিন আছে চাকরটা তোমাদের বাড়িতে?”
“মাস ছয়েক-”
“এর আগে কখনো কিছু হারিয়েছে ও আসার পর?”
“না। তাছাড়া ও কিছু কুড়িয়ে পেলে তখনই দিয়ে দেয়; একবার একটা একশো টাকার নোট ও ঝাড় দেবার সময় কুড়িয়ে পেয়ে মাকে ফিরিয়ে দিয়েছে, আর একবার দিদিভাইয়ের কানের সোনার দুল বাথরুমে কুড়িয়ে পেয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে, তাই বাড়ির সকলের ধারণা, ও আংটিটা চুরি করেনি। কেষ্টাও কাঁদছে, বলছে সে চুরি করেনি–”
“বাড়ি ঘর দোর নিশ্চয়ই সব ভাল করে খোঁজা হয়েছে?”
“অন্তত বার চারেক। ছোটকাকু আমাকে কী বলেছে জানো?”
“কী?”
“আমি যদি আংটিটা খুংজে বের করে দিতে পারি তো সে মেনে নেবে আমি গোয়েন্দাগিরি কিছু-কিছু করতে পারি।”
“তাই তো, তাহলে তো দেখছি আংটির একটা ফায়সলা তোমাকে করতেই হয় মিতুলবাবু, তা তোমার ধারণা এটা ঐ কেষ্টারই কাজ, তাই না?”
“হঁ্যা।”
“কেন বল তো?”
“তুমি শুনলে হাসবে না তো?”
“না,না, বলো কী বলতে চাও?”
“ছোটকাকু ভীষণ ভিতু। ভূতের ভয় তার খুব। তাই সে একা শুতে পারে না তিনতলার ঘরে, মা তাই কেষ্টাকে ছোটকাকুর ঘরে শুতে বলেছিল। কেষ্টা এখানে আসা অবধি তাই শোয়। তাছাড়া ছোটকাকুর সব কাজ ঐ কেষ্টাই করে, কেষ্টা না-হলে তার একদণ্ড চলে না। কেষ্টা ছোটকাকুর কাছে-কাছে থাকে, রাত্রে ঐ ঘরেই শোয়, হয়ত কাল রাত্রে কোন সময় কায়দা করে ছোটকাকুর আঙুল থেকে আংটিটা খুলে নিয়ে সরিয়ে ফেলেছে।”
“কিন্তু আংটিটা তোমার কাকুর আঙুলে বলছ বেশ টাইট হয়ে বসে ছিল–”
“হঁ্যা।”
“তবে, খোলার সময় জানতে পারল না, তবে…”
“কী তবে?”
“তোমার কাকুর বিছানার চাদর আর বালিশের ওয়াড়গুলো ভাল করে দেখো তো কোন-কিছুর দাগ-টাগ আছে কি না।”
“কিসের দাগ?”
“দেখোই না কোন-কিছুর দাগ আছে কিনা। আর একটা কাজ তোমাকে করতে হবে…”
“কেষ্টার বিছানাপত্র আর সুটকেশ তো? তাও দেখা হয়েছে। তাকে সার্চ করাও হয়েছে।”
“ভাল কথা, তোমার কাকুর হাতে কাল রাত্রে আংটিটা ছিল কিনা কেউ দেখেছে?”
“মা দেখেছে, রাত্রে টেবিলে বসে খাবার সময়ও আঙুলে ছিল আংটিটা। দিদিভাইও দেখেছে, ছিল।”
“হঁু। আচ্ছা তোমার কাকুর ঘরে জিনিসপত্র কী আছে?”
“কাকুর পড়ার টেবিল, একটা চেয়ার, বই-খাতাপত্র, আর একটা ছোট আলমারি, জামা-কাপড় রাখবার জন্য।”
“আর-কিছু নেই? কোন মূর্তি, বা ফুলদানি”
“মূর্তি নেই, তবে ফুলদানি আছে। কাকুর খুব ফুলের শখ, রোজ রাত্রে বাজার থেকে টাটকা ফুল নিয়ে আসে, সারারাত্রি আর পরের দিন রাত্রি পর্যন্ত সেই ফুল থাকে। কাকুই ফুলদানির ফুল বদলায়।”
“তাহলে কালকের ফুল আজ এখনো আছে?”
“আছে।”
“একটা কথা জানো? কেষ্ট আজ সকালে বাড়ির বাইরে গিয়েছিল কি?”
“না। ভোরবেলা উঠে কাকু তার আঙুলে আংটি না দেখে চেঁচামেচি শুরু করে। কেষ্টা তখনও ঐ ঘরে মেঝেতে ঘুমিয়ে, নাক ডাকছিল।”
“তাহলে বাড়ির বাইরে যায়নি?”
“না।”
“শোন মিতুলবাবু, আংটিটা তাহলে এখনও বাড়ির মধ্যেই আছে, কোথাও পাচার হয়নি।”
“কিন্তু–”
“যাও ভাল করে ঐ ঘরেই গিয়ে খঁুজে দ্যাখো। না-পেলে আমাকে জানিও, আর কেষ্টাকে বেরুতে দিও না।”
মিতুলবাবু ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই ফিরে এল, মুখে হাসি।
“কী খবর মিতুলবাবু?”, বিরূপাক্ষ শুধায়, “সংবাদ শুভ নিশ্চয়ই?”
“হঁ্যা আংটি পাওয়া গিয়েছে। তবে আমার ধারণাই ঠিক, এ কেষ্টারই কাজ।”
“কেষ্টা স্বীকার করেছে কিছু?”
“না, সে আগের মতই কাঁদছে আর বলছে, সে কিছু জানে না।”
বিরূপাক্ষ মৃদু হেসে বললে,“তা কী করে কোথায় পেলে বলো এবার শুনি।”
“প্রথমেই গিয়ে আমি কাকুর বিছানার চাদর আর বালিশের ওয়াড় পরীক্ষা করি। আগের দিনই চাদরটা মা বদলে দিয়েছিল। চাদরে তেলের দাগ দেখলাম সামান্য-”
“তারপর?”
“গন্ধ শঁুকে দেখলাম কড-লিভার তেলের গন্ধ।”
“কড-লিভার তেল?”
“হঁ্যা, কাকু তো রোজ খায় সকালে উঠে, তার ধারণা ওতে শরীর  সুস্থ থাকে। ছুটে গেলাম কাকুর কাছে, শুধালাম, কাকু আজ কড-লিভার অয়েল খেয়েছ? কাকু তো চটেই লাল। বলে, ইয়ার্কি দিচ্ছ-ইডিয়েট কোথাকার! কিন্তু কাকুর গা থেকে তখনও কড-লিভার অয়েলের গন্ধ বেরুচ্ছে। আমি বুঝলাম কী ঘটেছে।”
“কী ঘটেছে?”
“ঐ কড-লিভার অয়েলই কাকুর আঙুলে লাগিয়ে কুম্ভকর্ণ কাকুর আঙুল থেকে রাত্রে কোন একসময় আংটিটা খুলে নিয়েছে। তাহলে কোথায় রাখল সে আংটিটা? কোথায় রাখতে পারে ভাবতে-ভাবতে চোখ পড়ল ফুলদানিটার দিকে।”
“সাবাস, তারপর?”
“শেষ পর্যন্ত ফুলদানির মধ্যেই আংটিটা পাওয়া গেল। ভাগ্যিস তুমি কাকুর ঘরে জিনিসপত্র কী কী আছে তখন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে। কিন্তু তোমার কাছে আসার আগে কথাগুলো আমার মনে কেন হল না? হওয়া উচিত ছিল, তাই না?”
বিরূপাক্ষ মৃদু হাসছে।
“তুমি হাসছ বিরূকাকু?”
পাশেই শিশির বসে ছিল, সে বললে, “দুঃখ করো না মিতুলবাবু, তুমি এই বয়সেই যা বুদ্ধির পরিচয় দাও, বড় হলে তুমি বিরূপাক্ষ সেনকেও কুপোকাত করবেই-কিরীটী রায় বেঁচে থাকলে তাকেও টপকে যাবে তখন।”
“তা কেষ্টার কী ব্যবস্থা করলে মিতুলবাবু?” বিরূপাক্ষ জিজ্ঞেস করল।
“হাতে-নাতে তো ধরতে পারিনি, শুধু অনুমান-”
“তা ঠিক। তা ছাড়া বেচারা কেষ্টার বয়সই বা কী, চোদ্দ-পনের মাত্র, কিছুটা লোভে পড়েই অপকর্মটা করে ফেলেছিল।”
“মা কিন্তু বলেছে ওকে আর চাকরিতে রাখবে না। জানেন, আমার হাতে-পায়ে ধরে কান্নাকাটি করছিল, একটু আগে।”
“তোমার ছোটকাকু কী বলে?”
“ছোটকাকু বলেছে, ওর নাকি দশ বছর জেল হওয়া উচিত।”
সবাই হাসে।

ফ্ল্যাট রেস

/
ফ্ল্যাট রেস
জরাসন্ধ

সেদিন শুনলাম কুহু আর কেকাতে আড়ি হয়ে গেছে। হামেশাই হয়ে থাকে। যেখানে যত ভাব, সেখানে তত আড়ি। ওরা তো ছেলেমানুষ। বড়রাও কম যান না। এই তো কদিন আগে মিসেস কাঞ্জিলাল বলছিলেন ওঁদের ‘গৃহলক্ষী ক্লাব’-এর মেম্বার ছিলেন পঞ্চান্ন, কমে কমে পঁয়ত্রিশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণটা কী? না, এর সঙ্গে ওঁর মুখ দেখাদেখি বন্ধ, সি ব্লকের সঙ্গে ডি ব্লকের যাতায়াত নেই।

ছোটদের অবিশ্যি আড়ি থেকে ভাব হতে দেরি হয় না। কিন্তু কুহু আর কেকা এবার বেশ কিছুদিন ধরে যে যার বাড়িতে গঁ্যাট হয়ে– বসে আছে। ব্যাপার কী? একটা দিন মুখোমুখি বসে বকবক করতে না পারলে যাদের ভাত হজম হয় না, তারা হঠাত্‌ এরকম নন-কোঅপারেশন করে বসে আছে কেন?
বেড়াতে বেড়াতে গেলাম কুহুদির বাড়ি। প্রথমে কিছুই বলতে চায় না। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে অনেক করে বোঝাতে চোখ ছলছল করে বলল, “কেকাটা আমার মন্টুদাকে অপমান করেছে।”
“বল কী!”
“হঁ্যা, দেখুন না, সেদিন কাগজে ছবি বেরিয়েছে মন্টুদার। ওদের ক্লাবের স্পোর্টসে লঙ জাম্পে ফার্স্ট হয়েছে কিনা। কেকাকে দেখাতে নিয়ে গেলাম। তুই আমার বন্ধু, খুশী হবি তো? তা না। ঠোঁট উল্টে বলল এ যে তোর মন্টুদা, বুঝলি কী করে? কতগুলো লোক ভূতের মত দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটা না হয় ভালো ওঠেনি। তাই বলে আমার মন্টুদাকে ভূত বলবে!”
আমি বললাম, “তাই তো, ভারী অন্যায়।”
“আরো কী বলল শুনুন না। ‘খুব যে মন্টুদা মন্টুদা করিস, নিয়ে আয় না একবার, দেখি কত বড় স্পোর্টসম্যান। এই তো আসছে মাসে আমাদের মাঠে স্পোর্টস হচ্ছে। মেজকাকে বলে ওর নামটা ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে।’ আচ্ছা বলুন তো, মন্টুদা আসবে এই অজ পাড়াগাঁয়ের পচা স্পোর্টসে নাম দিতে! আর উনি দয়া করে ওঁর মেজকাকে বলে তাকে ঢুকিয়ে দেবেন!”
বলেই কান্না চাপতে চাপতে ছুটে বেরিয়ে গেল।
আঘাতটা সত্যিই ওর খুব লেগেছে। লাগবারই কথা। কেকাই বা ওসব বলতে গেল কেন? কুহু যে মন্টুদা বলতে অজ্ঞান সেটা তো সে ভাল করেই জানে।
এবার কেকাকে ধরলাম। সে স্বীকার করল, হঁ্যা অনেকটা ঐ ধরনের কথা সে বলেছে। কিন্তু খালি-খালি তো আর বলতে যায়নি। কুহু তার ঝন্টুদাকে নিয়ে অমন ঠেস দিয়ে বাজে কথা বলল কেন?
জানতে চাইলাম, “কী বলেছে কুহু?”
“বলে কিনা খুব তো মোহনবাগানের প্লেয়ার বলে ঢাক পিটিয়েছিলি। তোর মেজকা যদি খেলা বন্ধ করে না দিতেন, দেখা যেত। এসব কথার মানে কী আপনিই বলুন।”
ঘটনাটা আমি জানি। তোমরা যখন আনন্দমেলা পড় তোমাদেরও নিশ্চয়ই মনে আছে। কুহুর মুখে হরদম ‘মন্টুদা এই করেছে, মন্টুদা ঐ করেছে’ শুনে শুনে কেকার কান ঝালাপালা। একদিন আর থাকতে না পেরে বলে বসল, তার ঝন্টুদাও একজন দুর্দান্ত ফুটবলার, মোহনবাগানে খেলে। আসলে সে ফুটবল মাঠেও যায়নি কোনদিন। কিছুদিন পরেই ঝন্টু বেড়াতে এল ওদের বাড়ি। তখন ফুটবল মরশুম চলছে। ওদের গ্রামের উত্তরপাড়া এফ সির সঙ্গে দক্ষিণপাড়া ইলেভেন-এর সেমি-ফাইন্যাল। আর যায় কোথায়! সবাই মিলে ধরে বেঁধে তাকে নামিয়ে দিল। কেকাদের পাড়ার টীমের গোলকীপার। কেকা গিয়ে ধরল তার মেজকাকে কী করে মুখ বাঁচানো যায়। তিনি তাঁর ওকালতি বুদ্ধি খাটিয়ে গোলে বল যাবার আগেই এমন একটা গোল বাধিয়ে দিলেন যে খেলাই বন্ধ হয়ে গেল। মাঠের লোকেরা চালাকিটা ধরতে পারল না। কুহুর মনে কিছুটা সন্দেহ হয়ে থাকবে। কথায়-কথায় সেদিন বেরিয়ে পড়েছে। কেকাও পাল্টা ঘা দিয়ে বসেছে।
কুহুকে নিয়ে তার বাড়ির লোকেরা মহা ভাবনায় পড়লেন। কী হল মেয়েটার। মুখে হাসি নেই, কথা টথাও বড় একটা বলে না কারো সঙ্গে। স্কুলে একদিন গেল তো দুদিন গেল না। গানের মাস্টার এলে বলে, “আমার গলা ব্যথা।”
একদিন হঠাত্‌ দেখা গেল, সকাল থেকেই তার ঘরের দরজা বন্ধ। রবিবার বলে নটার সময় চান-খাওয়ার তাগিদ এল না। কিন্তু এগারোটা বাজবার পরেও বেরোচ্ছে না দেখে বৌদি এলেন ডাকতে। তিন চারবার ডাকাডাকির পর সাড়া এল ভারী গলায়, “তোমরা খেয়ে নাওগে। আমি আজ-খাবো না।”
“কেন, খাবে না কেন?”
“আমার খিদে নেই।”
“দোর খুলবে তো?”
“না।”
তারপর এলেন মা। প্রথমে সাধাসাধি, তারপর রাগারাগি, কুহু কোনটারই জবাব দিলনা, দরজাও খুলল না।
কদিন ধরে সারা ব্যাপারটা নাড়াচাড়া করে কুহুর সব রাগ গিয়ে পড়েছিল মন্টুদার ওপর। ঠিকই বলেছে কেকা। সে-ই কেবল মন্টুদা-মন্টুদা করে মরে। তিনি কোন্ লাটসাহেব যে একটিবারও তাদের বাড়িতে পায়ের ধুলো দিতে পারলেন না! হতে পারে তারা বড়লোক, খাস কলকাতার বনেদী গোষ্ঠী। কিন্তু কেকার ঝন্টুদারাও কম বড়লোক বা কম বনেদী নয়। মন্টু যেমন তালতলার তালুকদার বাড়ির মেজোছেলে, ঝন্টুও তেমনি বড়বাজারের বাঁড়ুজ্যে বাড়ির মেজোছেলে। দুদিকের সম্পর্কটাও একই রকম। মন্টু কুহুর পিসতুতো ভাই, ঝন্টু কেকার মাসতুতো ভাই। ঝন্টু সে-সম্বন্ধটা মনে রাখে। এরই মধ্যে দু-দুবার ঘুরে গেল মাসির বাড়ি। আর মন্টুবাবুর মামা-মামীর কথাও একবার মনে পড়ে না, বোন তো তার পরে।
বাবার কাছে খবর গিয়েছিল। তিনি এসে নরম সুরে ডাকলেন, “দরজাটা একটু খোল তো মা।” এবার আর না খুলে পারল না কুহু। বাবা ঘরে ঢুকতেই বলে উঠল, “আচ্ছা বাপি, মন্টুদা আমাদের বাড়ি একবারও আসে না কেন?”
হঠাত্‌ একথা কেন, বুঝতে পারলেন না ভদ্রলোক। তিনি ভেবেছিলেন, জটিলরকম কোনো কিছু ঘটেছে নিশ্চয়ই। এই গোছের সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে মেয়ে ঘরে দোর দিয়ে না-খেয়ে বসে আছে কেমন করে জানবেন? বললেন, “শুনেছি খুব খেলাধুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাই হয়তো আসতে পারে না।”
“মোটেই তা নয়। আমরা তো ওদের মত বড়লোক নই, পাড়াগাঁয়ে থাকি। তাই আসে না।”
“কী যে বলিস? মন্টু মোটেই সেরকম ছেলে নয়। তা এ নিয়ে তুই মন খারাপ করছিস কেন?”
“কেকার ঝন্টুদা কত আসে ওদের বাড়ি, কেমন হৈ চৈ করে। আর-” বাকীটুকু আর বলতে পারল না। দু’চোখে আঁচল চেপে ধরল।
বাবা এবার বুঝলেন, ব্যাপারটাকে মোটেই হালকা করে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বন্ধুর কাছে মেয়ের একটা মান আছে না? বললেন, “আচ্ছা, আমি তো আসছে সপ্তাহেই কলকাতা যাচ্ছি। দেখা হলে ওকে খুব বকে দিয়ে আসব। আর ওর মাকে বলে আসব শিগগিরই যেন একবার পাঠিয়ে দেয়। তুই কিছু ভাবিসনে।”
শিগগির আর হল না। মামা এত করে বলে গেছেন শুনেও ‘আজ যাই কাল যাই’ করে মাসখানেক পরে এল মন্টু। আর ঠিক সেই দিনই এখানকার স্পোর্টস। কুহু তো চটে লাল, “কে আসতে বলেছিল তোমাকে?”
মন্টু হাসল। “জানিস তো আমার কত কাজ! ডিসেম্বর মাস পড়ে গেছে। রোজই কোনো না কোনো ক্লাবে-”
“আর আমাদের ক্লাবটা বুঝি এতই ফ্যালনা?”
“ফ্যালনা কেন হবে? এই তো ঠিক দিন বুঝে এসে পড়েছি।”
“হুঁ, দুটোয় স্পোর্টস আর বাবু এসে পৌঁছলেন বেলা এগারোটায়!”
“তাতে কী হয়েছ? তুই চলে যা না। আমি মামার সঙ্গে ঠিক সময়ে গিয়ে হাজির হবো।”
“শুধু হাজির হলেই হবে না মশাই, আপনাকে নামতে হবে।”
মন্টু মনে-মনে হেসে খুন। মেয়েটা বলে কী!
এই গেঁয়ো স্পোর্টসে পার্ট নেবে মন্টু তালুকদার! তার ক্লাবের ছেলেরা শুনতে পেলে তাকে সঙ্গে-সঙ্গে বয়কট করে দেবে। তাছাড়া মাঠের যা ছিরি। আসবার সময় দেখে এসেছে। আগাগোড়া এবড়ো-থেবড়ো, মাঝে-মাঝে গর্ত। এর মধ্যে ছোটে কেমন করে? পাড়াগেঁয়ে ভূত তো। ওরা সব পারে।
কুহুকে বলল, “কী জানিস পর পর পনের দিন একটানা দৌড়-ঝাঁপ লাফালাফি করে শ্রীচরণ দুটির অবস্থা তেমন সুবিধের নয়। কটা দিন ছুটি চাইছে।”
“তার চেয়ে বল না কেন, ইচ্ছে নেই। একে পাড়াগাঁ তায় ছোট ক্লাব-” ঠোঁট উলটে বলল কুহু।
মন্টুকে হার মানতে হল, “আচ্ছা বাবা নামবো। তবে কোনো বড় ইভেন্ট্ দিতে মানা করিস। ছোটোখাটো কিছু একটা-”
বলতে বলতেই ক্লাবের সেক্রেটারি দলবল নিয়ে এসে পড়লেন। বললেন, “বেশ তাই হবে। আমাদের মাঠে আপনার পায়ের ধুলো পড়বে। তাতেই আমরা ধন্য।”
ঠিক হল, একশ গজ ফ্ল্যাট রেস্-এ দৌড়বে মন্টু।
এ গাঁয়ের ইতিহাসে এত বড় ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। তালতলা ইউথ ক্লাবের দুর্দান্ত স্পোর্টস ম্যান মন্টু তালুকদারকে চোখে দেখাই ভাগ্যের কথা। তার ওপরে তার দৌড়ও দেখা যাবে। কাতারে-কাতারে লোক এসে জড় হল মাঠে। মাইক তো নেই। একটা ছেলে- চেহারা সরু হলেও, গলাটা বেশ মোটা- মুখে মস্ত বড় এক চোঙা লাগিয়ে চেঁচাচ্ছে, ‘‘বন্ধুগণ, স্বনামধন্য ক্রীড়াবিদ্ মন্টু তালুকদার আজ আমাদের মধ্যে উপস্থিত। ১০০ গজ ফ্ল্যাট রেস্-এ আপনারা তাঁকে দেখতে পাবেন।”
ঐ ইভেন্টে রাখা হয়েছিল সকলের শেষে, লোকজন আটকে রাখার জন্যে। সারা মাঠ উত্‌সাহ, উত্তেজনায় ফেটে পড়েছে। চোঙাওয়ালা পরপর ছটা নাম বলে গেল। সকলের শেষে মন্টু তালুকদার। সঙ্গে সঙ্গে তুমুল হাততালি।
মেয়েদের ভিড়টাও কম নয়। কুহু তো আগেই এসে বসে গেছে একেবারে সামনের সারিতে। কিন্তু ‘সে’ কোথায়? আসবে নিশ্চয়ই। তবু না দেখা পর্যন্ত মনটা ঠাণ্ডা হচ্ছিল না। না এলে সব মাটি। ঘাড় ফিরিয়ে দেখছিল বারবার। ঐ তো এসে গেছে। বড় বড় চোখ করে মন্টুদাকে দেখছে। কুহু, মনে মনে বলল, আনতে পারব না বলেছিল তো? এবার দ্যাখো, ভাল করে দ্যাখো।
স্টার্টার পিস্তলের আওয়াজ করলেন। দৌড় শুরু। সকলের আগে মন্টু তালুকদার। সারা মাঠ গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে। হঠাত্‌ সব চিত্‌কার যেন ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল।
অ্যাক্সিডেন্ট! মন্টু তালুকদার উপুর হয়ে পড়ে আছে ট্র্যাকের উপর। সব লোক ছুটে চলেছে সেই দিকে। তখন অত ভিড় ঠেলে কাছে যাওয়া আমার সাধ্য নয়।
সন্ধ্যার পর গেলাম কুহুদের বাড়ি। মাঠেই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল ‘মন্টুদার’ সঙ্গে। একবার খবর নেওয়া দরকার। বাইরের ঘরেই পাওয়া গেল। পায়ে চুন হলুদ লাগিয়ে দিচ্ছে কুহু। পাশে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে কেকা! আমাকে দেখে বলে উঠল, “আচ্ছা, আপনিই বলুন তো জ্যাঠামশাই, নেহাত হাসি তামাশা করে সেই কবে কী বলেছিলাম, আর সেই জন্যে কিনা ও’র মত একজন এতবড় স্পোর্টসম্যানকে টেনে এনে আমাদের এই পচা মাঠে দৌড় করিয়ে ছাড়ল! কী জেদী মেয়ে বাবা!”
কুহু মাথা নিচু করেই বলল, “সত্যি আমি ঠিক বুঝতে পারিনি, এরকম মাঠে দৌড়নো ওঁর অভ্যাস নেই। একটা গর্তের মধ্যে পা পড়ে-”
“আহা তাতে হয়েছেটা কী?” বাধা দিল মন্টু। আমার দিকে ফিরে বলল, “আপনি এসেছেন ভালোই হয়েছে। আমি এদের কিছুতেই বোঝাতে পারছি না, এরকম হামেশাই ঘটে থাকে আমাদের।”
আমি বললাম, “আমারও একটা ধাঁধা কাটল।”
“ধাঁধা!”
“হঁ্যা, তোমাদের লংজাম্প, হাই জাম্প, রিলে রেস্, অবস্ট্যাকল রেস, স্যাক রেস-এসবগুলোর মানে বুঝতে অসুবিধে হয় না। কিন্তু ফ্ল্যাট রেস কথাটা ঠিক ধরতে পারিনি। আজ সব পরিষ্কার হয়ে গেল যখন দেখলাম-”
“আমি ফ্ল্যাট হয়ে পড়ে আছি,” বলে হো হো করে হেসে উঠল মন্টু। তাকে ছাপিয়ে গেল কুহু ও কেকার খিলখিল হাসি।

শ্যালক সংশ্লেষ

/

শ্যালক সংশ্লেষ

বিপুল মজুমদার


অঙ্ক স্যারের কাছে টিউশন পড়ে ফেরার পথে রাস্তায় দুই বন্ধুতে জোর তর্কাতর্কি। দু’জনেই ক্লাস ইলেভ্নের ছাত্র। সমীরের বক্তব্য, প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বয়সে বড়। চন্দনের এতে প্রবল আপত্তি। সে বলছে রাহুল গাঁধী। শেষপর্যন্ত বিতর্কটা বাজির দিকে গড়িয়ে গেল। ঠিক হল, যে হারবে, সে জয়ীকে চারখানা রসগোল্লা খাওয়াবে। বাজির শর্ত চূড়ান্ত হতেই দু’জনে আর সময় নষ্ট করল না। সঙ্গে-সঙ্গে রাস্তার ধারের এক সাইবার ক্যাফেতে ঢুকে পড়ল। সেখানে মালিক লোকটিকে পটিয়ে-পাটিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দু’মিনিটের মধ্যেই জেনে ফেলল, সত্যিটা কী। প্রিয়ঙ্কা নয়, রাহুল গাঁধীই বড়। রাহুলের জন্ম ১৯৭০-এ আর প্রিয়ঙ্কার ’৭২-এ।
বাজি জিতে উল্লসিত চন্দনের যেন আর তর সয় না। সে রসগোল্লা খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করায় সমীর বেশ অস্বস্তিতেই পড়ল। রসগোল্লা খাওয়ানোর মতো যথেষ্ট রেস্ত নেই তার পকেটে। শেষে বন্ধুর জোরাজুরিতে অতিষ্ঠ হয়ে সে বলে উঠল, “কথায় আছে না, লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন? আমারও তেমনই একটা গোপন ব্যাপার আছে, লাগে মিষ্টি, দেবে মোহন সেন! এমন একটা মিষ্টির দোকানে তোকে নিয়ে যাব, যেখানে রসগোল্লা কেন, ইচ্ছে হলে মুফতে তুই যা খুশি খেতে পারবি!”
বন্ধুর কথাটাকে নিছক মজা ভেবে নিয়ে চোখ টিপল চন্দন, “দোকানটা নিশ্চয়ই তোর শ্বশুরের?”
সমীরও চোখ টিপে পালটা ফিচেল হাসি হাসল, “শ্বশুরের নয়, জামাইবাবুর।”
“বলিস কী! পম্পাদি যে ডুবে-ডুবে জল খাচ্ছে, তা তো জানতাম না,” মুখরোচক খবরের সন্ধান পেয়ে রীতিমতো উত্তেজিত চন্দন, “কবে থেকে এসব চলছে রে?”
অনেকদিনের চেপে রাখা গোপন কথা অন্তরঙ্গ বন্ধুকে বলার সুযোগ পেয়ে দ্বিগুণ উত্তেজিত হয়ে উঠল সমীর। ভুরু নাচিয়ে বলল, “আরে ধুর, দিদি কিছুই জানে না!
পুরোটাই একতরফা ব্যাপার। মদনমোহন মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিকের ছেলে মোহনদা কিছুদিন হল দিদির প্রেমে পড়েছে, কিন্তু লোকটার দৌড় ওই পর্যন্তই। মুখ ফুটে যে প্রপোজ় করবে, সে হিম্মত নেই। শেষটায় কী মনে হওয়ায় পাকড়াও করেছে আমাকে। তারপর থেকে আমিই মোহনদার ডাকহরকরা!
“মিষ্টির দোকানের সামনে দিয়ে কখনও যেতে দেখলেই হয়েছে, অমনি ডেকে নিয়ে আদর করে ভিতরে বসাচ্ছে আমাকে। তারপর ভরপেট মিষ্টি খাইয়ে একটা খাম গুঁজে দিচ্ছে আমার হাতে।”
“খামের মধ্যে নিশ্চয়ই লাভ লেটার?” চন্দনের দু’চোখে অপার কৌতূহল।
“সে আর বলতে! গত দু’মাসে এভাবে মোট আটখানা লাভ লেটার আমার হাতে দিয়েছে মোহনদা। মিষ্টির দোকানদার হলে কী হবে, দারুণ লেখার হাত মাইরি! প্রত্যেকটা চিঠিই সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে  রাখার মতো।”
চন্দন বিস্মিত, “তুই বলছিস, পম্পাদি কিছুই জানে না। তা হলে খামোকা চিঠিগুলো তুই নিচ্ছিস কেন? আর নিয়ে করছিসটা কী?”
“ধীরে, বত্‌স, ধীরে,” বন্ধুর প্রশ্নের বহরে হেসে ফেলল সমীর, “এমনি-এমনি কি নিচ্ছি আর? প্রথমদিন ভরপেট মিষ্টি খেয়েই বুদ্ধিটা স্পার্ক করেছিল মাথায়। যদ্দিন পারি, এর থেকে ফায়দা তুলে যেতেই হবে। তুই তো জানিস, মিষ্টি খেতে কেমন ভালবাসি আমি! তাই ভাবলাম, দিদির হাতে চিঠি পৌঁছনোর জন্য মোহনদা যে খাতিরটা আমাকে করছে, সেটা দীর্ঘদিন ধরে এনজয় করতে হলে চিঠিগুলো হাপিস করতে হবে আমাকেই। এবার সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট প্রশ্ন হল, লাভ লেটারগুলো নিয়ে আমি কী করছি? স্ট্রেট আমার পড়ার টেব্লের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখছি। যাকে বলে একেবারে কফিনবন্দি করে রাখা, তাই করছি, বস!”
সমীর যে ডাকাবুকো ছেলে তা চন্দন জানে। কিন্তু তাই বলে এতটা! সে চোখ কপালে তুলে বলল, “কিন্তু আটখানা লাভ লেটার লিখে যে-কোনও লোকই তো অধীর হয়ে উঠবে। পম্পাদির কাছ থেকে উত্তরের জন্য মোহনদা তোকে চাপ দিচ্ছে না?”
“দিচ্ছে না আবার? রেগুলারই দিচ্ছে! আমি এই বলে ঠেকিয়ে রেখেছি যে, দিদি এখনও মনস্থির করে উঠতে পারেনি। করতে পারলেই জবাব দেবে।”
ফোকটে মিষ্টি খাওয়ার জন্য এতবড় ঝুঁকি নেওয়া! ধরা পড়লে দু’তরফের কেউই সমীরকে আস্ত রাখবে না। চন্দন তাই ঢোক গিলল, “কিন্তু একটা সময় তো আসবেই, যখন মোহনদা ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে যাবে। তখন?”
বন্ধুর উদ্বিগ্ন প্রশ্ন সমীর গায়েই মাখল না। বরং তাকে বেশ অবাক করেই খিকখিক করে হেসে উঠল। কোনওরকমে হাসি সামলে বলল, “তখনকার কথাও ভেবে রেখেছি, দিদির হয়ে নিজে উত্তর দিয়ে যাব। তাতেও বেশ কিছুদিন মিষ্টি খাওয়াটা চালিয়ে যেতে পারব আশা করি। তারপরও যদি সঙ্কটে পড়ি তখন তূণ থেকে শেষ অস্ত্রখানা বের করব। সব কেচ্ছা চুকিয়ে দিতে স্ট্রেটকাট লিখব, আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে, মোহন! ভবিষ্যতে চিঠি  লিখে তুমি আর আমাকে বিরক্ত করবে না। বিদায়!”
বন্ধুর আত্মবিশ্বাস দেখে চোখ টেরিয়ে গেল চন্দনের। তবু গলায় সংশয় মিশিয়ে বলল, “বাহ্, তুই চিঠিতে এসব লিখবি আর মোহনদা সেটা চোখ বুজে মেনে নেবে? প্রেম জিনিসটা এত জলভাত, এটা ভাবলি কেমন করে? লোকটা বিগড়ে গেলে কিন্তু কেসটা বাজে দিকে টার্ন করতে পারে।”
“নাহ্, তা হবে বলে মনে হয় না। একনম্বরের কেবলু বলতে যা বোঝায়, মোহনদা হল তাই। ওসব লোককে ম্যানেজ করতে আমার একমিনিটও সময় লাগবে না, তুই দেখে নিস।”

।। ২ ।।
uk
মদনমোহন মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল সমীর। পিঠের ব্যাগটাকে ঠিকঠাক করে চাপা গলায় চন্দনকে বলল, “শোকেসের ওপাশে যে ফরসা, হিরোমার্কা লোকটাকে দেখছিস, ওই হল মোহনদা। আমরা এখানে দাঁড়িয়ে একটু গল্প করার ভান করি। দেখতে পেলে কেমন হইচই ফেলে দেবে দেখিস।”
একটু পরেই সমীরের কথাটা ঠিক মিলে গেল। ওদের দিকে চোখ পড়তেই শোকেসের কাচের উপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল মোহনদা, “এই, সমীর, শোনো একবার, তোমার সঙ্গে একটা খুব দরকারি কথা আছে।”
কথাটা যে কী, সমীর তা ভালই জানে। খেজুরে কথাবার্তার ফাঁকফোকরে ন’নম্বর লাভ লেটারটা কায়দা করে সমীরের পকেটে চালান করে দেওয়াই আসল উদ্দেশ্য। সমীর চন্দনকে সঙ্গে নিয়ে শোকেসের উলটোদিকে পৌঁছে গেল। মুখে হাসি
টেনে বলল, “বলুন, মোহনদা, কী বলবেন।”
“এভাবে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কথা হয় নাকি? ভিতরে এসে বোসো, একটু জিরিয়ে নাও, তারপর তো কথা,” কথাটা বলে চন্দনের উপর চোখ পড়তেই ভুরু নাচাল মোহনদা, ‘‘ওকে তো চিনলাম না। কে ও?”
“আমার বন্ধু, মোহনদা। ওর নাম চন্দন। আমরা এক ক্লাসেই পড়ি।”
“তা বেশ তো, বন্ধুকে নিয়ে ভিতরে এসে বোসো না। বহুদিন পর দোকানে আবার নলেন গুড়ের সন্দেশ করেছি। দু’জনে মিলে চেখে দেখে বলো তো কেমন হয়েছে।”
সমীরের মনের মধ্যে আনন্দের চোরা স্রোত বয়ে গেল। এসো বাবা, লাইনে এসো! সে চন্দনের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে পাকা অভিনেতার মতো মুখে একটা লাজুক ভাব ফুটিয়ে তুলল, “এই জন্যই এই রাস্তায় আসতে চাই না, মোহনদা। আপনি খাওয়ার জন্য এত জোরাজুরি করেন না…”
শুনে আহ্লাদে যেন গলে পড়ল মোহনদা, “কী বলছ, ভাই, তোমাকে জোরাজুরি করব না তো কাকে করব? তুমি হলে গিয়ে আমার নিজের লোক, আপনজন! আরে এসো, ভিতরে এসো।”

ভিতরে ঢুকে দোকানের টেব্লে দুই বন্ধু গুছিয়ে বসতে না-বসতেই একজন কর্মচারী দু’প্লেট ভর্তি মিষ্টি নিয়ে হাজির। প্লেটে নলেন গুড়ের সন্দেশ তো রয়েছেই, সঙ্গে রয়েছে রসগোল্লা, পান্তুয়া আর কমলাভোগও। মিষ্টি দেখে লোভে জিভ টসটস করলেও মুখখানা ভাবলেশহীন রাখার চেষ্টা করল সমীর। ঠোঁট কামড়ে বলল, “শুধু নলেন গুড়ের সন্দেশ দিলেই তো পারতেন! খামোকা এত কিছুর কী দরকার ছিল?”
মোহনদা হাসল একটু, “তোমাকে
আদর-আপ্যায়ন করার এই বোধ হয় আমার শেষ সুযোগ, সমীর। আগামিকাল থেকে আমি আর এই মিষ্টির দোকানে বসছি না। বাবা আমাদের দুই ভাইকে ব্যবসা ভাগ করে দিয়েছেন। ভাইয়ের ভাগে পড়েছে এই দোকানটা। আমি বসব আমাদের কলোনি মোড়ের মোবাইলের দোকানটায়।”
সবে নলেন গুড়ের একটা সন্দেশ মুখে পুরেছে সমীর, আর-একটু হলে সেটা গলায় আটকে যেত। জল খেয়ে স্বাভাবিক হয়ে সমীর জানতে চাইল, “কোন মোবাইলের দোকানটা বলুন তো?”
“ওই তো বিবেকানন্দের স্ট্যাচুর উলটোদিকে বড় মোবাইলের দোকানটা, ওখানেই বসব কাল থেকে।”
মিষ্টি খাওয়ার ভবিষ্যত্‌ অন্ধকার বুঝে মোহনদাকে লুকিয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সমীর। মুখটাকে আমসি করে বলল, “আপনার এই মিষ্টির দোকানের সেল কিন্তু ভালই ছিল, মোহনদা। ওই মোবাইলের দোকানে শিফ্ট করে বোধ হয় ভুল করলেন।”
মোহনদা থতমত খেয়ে গেল। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বলল, “মোবাইলের দোকানটা কিন্তু ভালই চলে, সমীর। আসল কথাটা কী জানো, বাবার ইচ্ছে, বছরদুয়েকের মধ্যে আমার বিয়ে দেবেন। বিয়ের বাজাকে ছেলের যাতে দর বাড়ে, সেই জন্য এসব কাণ্ডকারখানা।”
মিষ্টির দোকান থেকে মোহনদার সরে যাওয়া মানে সমীরের হাতে হ্যারিকেন! ব্যাপারটা মালুম হওয়ায় চন্দন বেশ মুখ টিপে হাসছিল। বন্ধুকে হাসতে দেখে সমীরের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। শুকনো হেসে মোহনদাকে বলল, “ভবিষ্যতে কখনও যদি মোবাইল কিনি, আপনার দোকান থেকেই কিনব, মোহনদা। তখন বেশি-বেশি করে রিবেট দেবেন তো?”
“রিবেট কী বলছ, তোমাকে আস্ত একটা মোবাইলই গিফ্ট করব,” কথাটা বলেই চন্দনকে আড়াল করে পকেট থেকে একটা সাদা খাম বের করল মোহনদা। খামটা চুপিসারে চন্দনের হাতে চালান করে দিয়ে নিচু গলায় বলল, “পম্পাকে বোলো এবার যেন ডিসিশন নেয়। আর যেন না ঝোলায়।”
মিষ্টির দোকান ছেড়ে বাইরে এসে চোখদু’টোকে বড়-বড় করে ফেলল চন্দন। সমীরের মুষড়ে পড়া মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “দিল আছে বটে তোর মোহনদার। একটুতেই কেমন মোবাইল গিফ্ট করার কথা বলে দিল! আমি বলি কী, আর কায়দা না মেরে এবার পম্পাদির হাতে মোহনদার চিঠিগুলো তুলে দে। এমন জামাইবাবু পাওয়া কিন্তু ভাগ্যের ব্যাপার।”
ukzz
সমীরের মুখ তবু পানসে, “ধুর, কোথায় মিষ্টি, আর কোথায় মোবাইল! বারবার তো মোবাইল নেওয়া যাবে না। চিঠিগুলো হল আমার তুরুপের তাস। সেগুলো এখনই দিদির হাতে তুলে দিয়ে মরি আর কী! দু’জনে চেনাজানা হয়ে গেলে মোবাইলের কথাটা যে মোহনদার মাথা থেকে ফুড়ুত্‌ হয়ে যাবে না, সেটা কে বলতে পারে!”
বন্ধুর কথায় আঁতকে উঠল চন্দন, “তার মানে মোবাইল গিফ্ট না পাওয়া পর্যন্ত তুই এমনভাবে চালিয়ে যাবি?”
“সে আর বলতে! আমার দিদিকে তুই চিনিস না। আমার চেয়ে চারবছরের বড় হলে কী হবে, উঠতে-বসতে সর্বক্ষণ আমায় শাসন করছে। দু’জনের প্রেমটা হয়ে গেলে  ও-ই হয়তো মোহনদাকে বলে দেবে, ওইটুকু ছেলেকে এখনই মোবাইল দেওয়ার কোনও দরকার নেই। আগে কলেজে উঠুক, তারপর দিয়ো। তাই আগে মোবাইল পাই, তারপর চিঠি দেওয়ার প্রশ্ন।”

।। ৩ ।।
শাহরুখ খানের নতুন সিনেমা। চারটে সাতটার শো। হলের সামনে অল্পবয়সি ছেলেমেয়েরা মাছির মতো ভনভন করছে। ফিজ়িক্স স্যারের কোচিং ক্লাস কেটে সমীর আর চন্দনও এসে হাজির হয়েছে সিনেমা হলে। দুই বন্ধুই শাহরুখ খানের ডাই হার্ড ফ্যান। অনেক ঠেলাঠেলি করে ব্যালকনির দু’খানা টিকিট কাটতে পেরে রীতিমতো উল্লসিত দু’জনে। হঠাত্‌ চন্দনের কী হল কে জানে, হলে ঢুকে সিটে বসতে না-বসতেই কিছু একটা দেখে সহসা রুমাল দিয়ে মুখটাকে ঢেকে ফেলল। ভয়ার্ত গলায় বলল, “সমীর রে, তুই এবার গেলি বোধ হয়। আমাদের দশ-বারোটা রো নীচে ডানদিকের দেওয়াল ঘেঁষে পম্পাদি বসে আছে!”
বন্ধুর কথাটা কানে যেতেই সমীরের বডি ল্যাঙ্গওয়েজ বদলে গেল। চকিতে পাশের দর্শকের কাঁধের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে-করতে বলল, “যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধে হয়! বহুত ঝামেলা হল দেখছি, দেখতে পেলে দিদি কথাটা বাবা-মাকে ঠিক লাগিয়ে দেবে।”
চন্দন হিসহিস করে উঠল, “বাঁচতে চাইলে রুমাল দিয়ে মুখটাকে ঢেকে ফ্যাল।”
সমীর অবশ্য সে পথে গেল না। ঝটিতি গলা থেকে মাফলারটা খুলে নিয়ে নাক-মুখ, মাথা পেঁচিয়ে এমনভাবে বাঁধল, যাতে তাকে চেনা না যায়। আশপাশের অনেকেই ড্যাবডেবিয়ে ওর কাণ্ডকারখানা দেখছে তখন। সেসবের তোয়াক্কা না করে সে ফিসফিস করে চন্দনকে বলে উঠল, “তোর কী মনে হয়, দিদি আমাকে দেখছে?”
চন্দন কাঁধ ঝাঁকাল, “মনে হয় দ্যাখেনি। পাশের সিটের লোকটার সঙ্গে গল্পে এমন বুঁদ হয়ে আছে যে, এদিকে তাকানোর ফুরসতই বা কোথায়!”
চন্দনের কথার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত
লুকিয়ে আছে জেনেও সমীর কোনও তর্কে গেল না। উদ্বিগ্নভাবে বলল, “লোকটা দেখতে কেমন রে?”
খানিক উঁকিঝুঁকি মেরে মাথা নাড়ল চন্দন, “না, পিছন থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কিছু মনে করিস না, পম্পাদি কি কারও সঙ্গে প্রেম-ট্রেম করে?”
সমীর থমকে গেল। মাফলারের আড়ালে থাকা চোখদু’টো পিটপিট করে বলল, “আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে কলেজের কয়েকজনের সঙ্গে ওর হেভি দোস্তি আছে। আচ্ছা, বাঁ কানে দুল আছে কি না, দ্যাখ তো? দুল থাকলে ওটা তাপসদা হবে।”
বন্ধুর কথায় মুখের রুমাল সরিয়ে উঁকি মারল চন্দন। একনজর দেখেই বলল, “নাহ্, কোনও দুল-টুল নেই।”
“তা হলে দ্যাখ তো, চুল লালচে কি না? লালচে হলে পুষ্করদা হতে পারে।”
“নাহ্, চুল পুরোপুরি কুচকুচে কালো।”
চন্দনের কথা ফুরোতেই হল অন্ধকার হয়ে শো শুরু হয়ে গেল। এরপর ইন্টারভ্যাল হতেই চন্দন বলল, “তুই মাফলার জড়িয়ে চুপচাপ বসে থাক, সমীর। আমি কাছে গিয়ে টুক করে একবার দেখে আসি, পম্পাদির পাশের লোকটা কে।”
মিনিটখানেক চক্কর কেটে ফিরে এল চন্দন। চেয়ারে বসেই উত্তেজিতভাবে বলে উঠল, “এ কী অদ্ভুত কাণ্ড! তোর দিদির পাশে মোহনদা বসে আছে রে!”
“মোহনদা? কী ফালতু বকছিস!” মাফলারের আড়ালে থাকা সমীরের চোখ দু’টো ঠিকরে বেড়িয়ে এল, “তুই ঠিক দেখেছিস?”
“ঠিক মানে? একেবারে হান্ড্রেড পারসেন্ট ঠিক! সেদিন মিষ্টির দোকানে মোহনদা লোকটাকে এতবার দেখেছি যে, ভুল হওয়ার কোনও চান্স নেই।”
মোহনদার সঙ্গে দিদির যোগাযোগটা কি ভূতে করিয়ে দিল! সমীর ভেবে কোনও কূলকিনারাই পেল না। তা হলে কি এমন হয়েছে, ভাবী শ্যালকের হাতে ন’নম্বর চিঠিটা গুঁজ়ে দেওয়ার পরও কোনও সুরাহা না হওয়ায় একরকম মরিয়া হয়েই দিদির সঙ্গে কথা বলেছে মোহনদা? আর তাতেই দুধ জমে ক্ষীর? তাই যদি হয়, তা হলে সমীরের সমস্ত ফন্দিফিকিরই ফাঁস হয়ে গিয়েছে দিদির কাছে। ব্যাপারটা মাথায় খেলতেই আরও কুঁকড়ে গেল সে। তেতো পাঁচন গেলার মতো মুখ করে বলল, “হে ভগবান!”
শো ভাঙলে দিদিকে এড়ানোর জন্য শর্টকাট রাস্তা ছেড়ে ঘুরপথটাই বেছে নিল সমীর। চন্দন অন্য পাড়ায় থাকে। বাড়ি ফেরার জন্য ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগিয়েছে সে। সমীর একা-একাই হাঁটছিল। চওড়া রাস্তাটা ছেড়ে গলির মুখে এসে পড়তেই পিছন থেকে একজনের চিকন গলা শুনতে পেল। গলাটা শুনেই বুকটা ধড়াস করে উঠল সমীরের। দিদি চিত্‌কার করে বলছে, “অ্যাই, ভাই, দাঁড়া… দাঁড়া বলছি।”
শুনশান গলি। লোকের ভিড়ে মিশে গিয়ে গা ঢাকা দেবে সে উপায় নেই। অগত্যা ল্যাম্পপোস্ট হয়ে দাঁড়িয়েই পড়ল সমীর। কাছে এসে হাঁপাতে-হাঁপাতে পম্পা বলল, “কী রে, সিনেমাটা কেমন লাগল?”
“কোন সিনেমা? কীসের সিনেমা?” আকাশ থেকে পড়ার ভান করল সমীর।
ঠোঁট টিপে হাসল পম্পা, “ন্যাকামি করিস না। তুই ডালে-ডালে চললে আমি চলি পাতায়-পাতায়। তুই কি ভেবেছিস, আমি তোকে দেখতে পাইনি? মাফলার জড়িয়ে যতই সং সাজার চেষ্টা করিস না কেন, চেক শার্টটার জন্য ঠিক ধরা পড়ে গিয়েছিস।”
সমীর দ্রুত ভেবে নিল। কথায় আছে, আক্রমণই আত্মরক্ষার সেরা পথ। সে নিজের দিদির চোখে-চোখ রেখে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, “আমার চোখেও কিন্তু ধরা পড়ে গিয়েছিস তুই। মোহনদার সঙ্গে তো দিব্যি তো পাশাপাশি বসে সিনেমা দেখছিলি। তা এভাবে ডুবে-ডুবে জল খাওয়া কদ্দিন চলছে?”
সমীরের কথায় পম্পার মেজাজ হঠাত্‌ চটকে গেল। গলায় ঝাঁঝ তুলে বলল, “ডুবে-ডুবে জলটা তো খাচ্ছিলি তুই! ওর লেখা চিঠিগুলো একের পর-এক টেব্লের ড্রয়ারে চালান করে দিয়ে ভেবেছিলি, আমি কিছুই টের পাব না। কিন্তু কপালে প্রেম থাকলে ঠেকাবে কে! একদিন টেব্ল গোছাতে গিয়ে চিঠিগুলো হঠাত্‌ আবিষ্কার করলাম। একটা নয়, দু’টো নয়, একসঙ্গে ছ’-ছ’খানা চিঠি। উত্তর পাচ্ছে না, তবুও চিঠি লিখে যাচ্ছে বেচারা। সহানুভূতিতে মনটা গলে গেল। অনেক ভেবে শেষটায় নিজে থেকেই যোগাযোগ করলাম মোহনের সঙ্গে।”
“ছ’খানা চিঠি… তার মানে মানে তোরা আগে থাকতেই…” কিছু বুঝতে না পেরে সমীর তাকাল।
“হ্যাঁ, মোহন ছ’নম্বর চিঠিটা লেখার পরই আমি সব জেনে ফেলি।”
সমীর হতভম্ব, “তা হলে তারপরও কেন মোহনদা আরও তিনখানা চিঠি দিল আমাকে?”
“তোর সঙ্গে মজা করছিল। আমি বারণ করলেও শোনেনি। বলেছিল, ‘শালা-ভগ্নিপতির সম্পর্ক যখন, তখন খেলাটা চলতে থাকুক। দেখি না, কোথায় গিয়ে থামে ও।’”
সব কথা শুনে লজ্জায় নুয়ে পড়ল সমীর। শ্লথ পায়ে হাঁটতে-হাঁটতে বলল, “আচ্ছা ঘোল খাওয়াল বটে মোহনদা। মানুষটা যে এত চালাক, কে জানত!”
ভাইয়ের কথা শুনে শব্দ করে হেসে উঠল পম্পা। হাসি থামিয়ে বলল, “তুই নাকি ওর কাছ থেকে মোবাইল কিনবি বলেছিস?”
সমীর ঘাবড়ে গেল। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতে-করতে বলল, “হ্যাঁ, বলেছিলাম তো… মোহনদা তো বলছিল আর মিষ্টির দোকানে বসবে না, মোবাইলের দোকানে বসবে। সেই জন্য ভেবেছিলাম… আসলে… ইয়ে মানে…”
পম্পা উত্তরে বলল, “ও বলেছিল, তোকে একটা মোবাইল গিফ্ট করবে। কিন্তু আমিই বারণ করে দিয়েছি। বলেছি, ভাই আগে কলেজে উঠুক, তারপর দিয়ো।”
“তুই না একটা যা তা,” রেগে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল সমীর, “কলেজে উঠতে তো এখনও দেড়-দু’বছর দেরি আছে।”
“হোক না দেরি। এখন মোবাইল পেলে বাবার জেরার মুখে পড়তে হবে। তখন কী বলবি বাবাকে? মোহন বলেছে, দেড়-দু’বছরের মধ্যে বিয়েটা সেরে ফেলবে। তারপর মোবাইল দিলে তো কারও কিছু বলার থাকবে না।”
সমীর থ। নদী দিয়ে জল যে অনেকদূর গড়িয়ে গিয়েছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে। এখন দর্শক ছাড়া আর কোনও ভূমিকায় মানাবে না তাকে। তবু মুখটাকে পানসে করে সে বলল, “এতদূর পর্যন্ত তোরা ভেবে ফেলেছিস? পারিসও বটে!”
পম্পার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি। চোখ টিপে বলল, “তবে মোবাইল তোকে ও দেবেই। আজ সিনেমা হলে ঢোকার
আগেই বলছিল, ‘সমীর ঘোঁট না পাকালে তোমাকে আমি পেতাম কিনা সন্দেহ। এতগুলো চিঠি একসঙ্গে দেখেছিলে বলেই না তোমার মন গলেছিল। ওর হাতযশেই যেহেতু আমাদের প্রেম দানা বেঁধেছে, সেইজন্য ওকে শ্যালক পুঁটুলি
না দেওয়াটা মহা অন্যায় হবে। আজ হোক, কাল হোক, মোবাইল আমি ওকে দেবই।’”
দিদির কথা শুনে চুপ করে গেল সমীর।
শুনশান রাস্তায় ক’দিন আগে বলা
চন্দনের একটা কথা ওর কানে এসে যেন আছড়ে পড়ল, এরকম জামাইবাবু পাওয়া কিন্তু ভাগ্যের ব্যাপার। বাতাসে ঠান্ডার আমেজ। নির্জন রাস্তায় দুলকি
চালে হাঁটতে-হাঁটতে নীরবে হেসে উঠল সমীর। অন্ধকার বলে ওর হাসিটা পম্পা দেখতে পেল না।

ভুতুড়ে ট্যাক্সি

/
ভুতুড়ে ট্যাক্সি
সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

ভাইফোঁটা শেষ হবে পাঁচটার মধ্যে। পপনের চার দিদি, আর তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে তার আগেই গিয়ে পৌঁছতে হবে। দিদি বেশ গিন্নি-বান্নি লোক, পপনকে ভীষণ ভালবাসেন। থাকেন বেলঘড়িয়ায়। পপনের বাবা পপনকে চিরকাল শিখিয়েছেন, সব কাজ প্রোটোকল মেনে করবে। এই প্রোটোকল ব্যাপারটা কী, পপন অনেকদিন পর্যন্ত বুঝত না, তবে ধারণা ছিল যার যা ন্যায্য সম্মান, তা-ই দিতে হবে। সুতরাং প্রোটোকল বলে, দিদির বাড়ি সব্বার প্রথম যেতে হবে। দিদির যখন বিয়ে হয়, তখন পপন খুব ছোট। তবু দিদির ধারণা, তিনি জানেন, পপন কী ভালবাসে। তাই সিমায়ের পায়েস করেছিলেন। আসলে পপন এখন আর সিমাই দেখতে পারে না। অথচ দিদিকে তো আর তা বলা যায় না। একটু মুখে তুলতেই হল। কিন্তু তাতে দিদি খুশি হলেন না; বললেন, অন্য দিদিদের বাড়ি খাবার জন্য বুঝি জায়গা রাখছিস? আচ্ছা বড়রা এত বোকা হয় কেন? যদি ও সিমাই ভালবাসত তা হলেই কি ওর বেশী খাওয়া উচিত হত? দিদির ছেলেটাকে পপন খুব ভালবাসে। বাবলু ফুটবল-খেলা দেখতে ভালবাসে, আর পপন মাঝে-মাঝে ওকে খেলা দেখাতে নিয়ে যায়। কিন্তু এবার ও খুব মনমরা, ওর সাধের টিম মোহনবাগান পাঁচ গোলে হেরেছে। পপনেরও খুব খারাপ লেগেছিল, কিন্তু বাবলুর মুখ একদম শুকনো। ওর সঙ্গে দু’-চারটে কথা বলে পপন উঠল। জামাইবাবু অফিসে, দেখা হল না। বগলে একটা প্যাকেটে খুব সুন্দর শার্টের কাপড় দিয়েছে দিদি।

মেজদির বাড়ি বেশী দূর নয়, ডানলপ ব্রিজের কাছেই। মেজদি বোধহয় দিদিদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী। ভারী মিষ্টি হাসি। অত্যন্ত নরম কোমল ব্যবহার। মেজজামাইবাবুও খুব ভাল। দারুণ হৈহৈ করেন। ওদের বাচ্চা-টাচ্চা নেই। তাই ওরা যখন-তখন বেরিয়ে পড়েন। মেজ-জামাইবাবুর কী একটা কারখানা আছে। সেখান থেকে ফাঁক পেলেই এক পাক ঘুরে আসেন। একবার পপনও গিয়েছিল। সেবার জামাইবাবু গেলেন বীরসিংহ গ্রামে। বোম্বে রোড ধরে গিয়ে পাঁশকুড়ার আগে একটা ডানহাতি রাস্তা; বেশ সরু। সেই রাস্তা ধরে গাড়ি চলতে লাগল। একসময় বীরসিংহ পৌঁছল গাড়ি। একটা ঘুমন্ত গ্রাম। বিদ্যাসাগরকে পপন খুব ভক্তি করে। যখন তাঁর জন্মস্থানে গিয়ে পৌঁছল, ওর কীরকম লাগতে লাগল। ওঁর জন্মস্থানে একটামাত্র বাঁধানো ফলক আছে। দেখল মেজদির চোখেও মুগ্ধ দৃ্ষ্টি। মেজ-জামাইবাবু অবশ্যি পাশের তেঁতুল গাছে ক্যায়সা তেঁতুল হয়েছে সেটাতেই বেশী উত্‌সাহিত বোধ করলেন। ফেরবার পথে ঘাটাল বলে একটা জায়গায় একটু নোংরা ধরনের হোটেলে দারুণ একটা খ্যাঁট হল।
ভাইফোঁটায় মেজদি ওকে একটা কলম দিলেন। সত্যি মেজদির বোধহয় মনের খবর জানবার যন্ত্র আছে। তা না-হলে দুদিন আগে যে ওর কলমটা খারাপ হয়ে গেছে, কী করে তা জানবেন? দুটি সন্দেশ খাওয়ালেন। আর দশটা টাকা দিলেন। বললেন, “আমাদের চার বোনের একটা মাত্র ভাই। আমার তোকে এইদিন অনেক খাওয়াতে ইচ্ছে করে। কিন্তু অন্যদেরও তো একই ইচ্ছা করে, তাই তোর ওপর জোর করব না। অন্য একদিন তোর মনের মতো দোকানে খেয়ে নিস।” সত্যি মেজদিটা বড্ড ভাল। কিন্তু কেমন যেন দুঃখী-দুঃখী ভাব। পপন এটা কিছুতেই বোঝে না।
এবার সেজদির বাড়ি। বি-টি রোডের ওপর একটা হাউসিং এস্টেটে ওদের বাড়ি। সেজদির বাড়িতে আসতেই সেজ-জামাইবাবু একগাল হেসে বললেন, “এসো বড় কুটুম।” বিয়ের দিন থেকেই উনি ওকে বড়কুটুম বলে ডেকে আসছেন। সেজ-জামাইবাবু একটা বড় কারখানায় কাজ করেন। ওঁর এখন সকালের শিফ্ট চলছে, তাই বাড়ি ছিলেন। সেজদি খুব ভাল রবীন্দ্রসংগীত গায়। সেজদি ষোড়শোপচারে বন্দোবস্ত করেছে। দিদিদের মধ্যে এই দিদিই ফোঁটা দেবার সময় নানারকম অদ্ভুত কাজ করে। কখনো হাতে ফল ধরায়। নানারকম জিনিস দিয়ে ফোঁটা দেয়। তার মধ্যে কাজলটা বড্ড বেশী দেয়। ওর ধারণা, কাজল দেখলে যম কিছুতেই কাছে ঘেঁষবে না। সেজদি ওকে একটা প্যান্টের কাপড় দিল। আর জোর করে খাইয়ে দিল লুচি আর মুরগীর মাংস। সেজদিটা ওইরকমই। এদিকে ফোঁটা দেবার সময় সব শাস্তর মানবে, কিন্তু খাওয়াবার বেলা মুরগী আর মাংসের বড়া। আসলে সেজদিই সত্যি জানে, পপন কী ভালবাসে। পপনের যখন দশ বছর বয়স, তখন সেজদির বিয়ে হয়েছে। হাতে দুটো প্যাকেট। সেজ-জামাইবাবু হাতে একটা কাঁধে-ঝোলানো ব্যাগ ধরিয়ে দিলেন। বললেন, “রাখো বড়কুটুম কাজ দেবে।”
বি টি রোডের ওপর এসে দাঁড়াল পপন। হাতঘড়িতে দেখল প্রায় সোয়া চারটে। ছোড়দির বাড়ি সেই বালিগঞ্জ। ছোড়দিকে নিয়েই পপনের যত মুশকিল। ছোড়দির বিয়ে হয়েছে সবে গত বছর। সুতরাং এতদিন ওরা একসঙ্গেই ছিল। পিঠোপিঠি ভাইবোন। চার বছরের তফাত। ছোড়দি এবার পার্টওয়ান দিয়েছে। কোন এক নাচের অনুষ্ঠানের শেষে ছোড়দির হবু শ্বশুর বাবার কাছে সমীরদার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব করে। বাবর খুব মত ছিল না, কিন্তু মা-ই উদ্যোগী হয়ে বিয়ে দিয়ে দিলেন। যতদিন একসঙ্গে ছিল, ততদিন ছোড়দির সঙ্গে পপনের নিত্য ঝগড়া লেগে ছিল। কোথাও কিছু নেই, মার কাছে গিয়ে লাগাত পপনের নামে। গৌতমের সঙ্গে একদিন স্ট্যাম্প কিনতে গিয়েছিল পপন। গৌতম ওদের স্কুলের নামকরা ছেলে। ছোড়দি বোধহয় দেখতে পেয়েছিল। বাড়ি এসেই লাগাল মার কাছে। “মা, তোমার ছেলেটা গোল্লায় যাচ্ছে। আজ দেখলাম একটা বিশ্ববকাটে ছেলের সঙ্গে রাস্তায় ঘুরছে।” পপনের প্রচণ্ড রাগ ধরে যায়। কোন কথা ভাববার আগেই ছোড়দির বিনুনিটা কেমন করে জানি ওর হাতে চলে এল। আসলে কিন্তু বিনুনি টানতে ও চায়নি। কিন্তু একবার যখন এসেই পড়ল, তখন দিল এক টান। ছোড়দি যা একখানা চেঁচাল, বোধহয় যে বাবাও অফিস থেকে শুনতে পেয়েছিলেন। মার কাছে বকুনিও খেল খুব পপন। অথচ ছোড়দির দোষটা কেউ দেখল না। পৃথিবীটা সত্যিই অদ্ভুত। সত্যিই তাই, তা না হলে ওই পাজী রাক্ষুসী (এ সব ভাষা পপন মাঝে-মাঝেই ব্যবহার করেছে ছোড়দি সম্বন্ধে) মেয়েটা বিয়ে হয়ে চলে যাবার পর কেন এত কষ্ট হবে পপনের? বাড়িটা কেন এত ফাঁকা লাগবে? আর আজ সকালবেলা উঠে প্রথমেই কেন মনে হয়েছিল, ছোড়দি থাকলে সকালেই তার ফোঁটা বাড়িতে হত? মনে হতেই ওর মনে হল, ছোড়দির বাড়ি তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে। মা ওকে ট্যাক্সির টাকা দিয়েছেন ওই রাস্তাটুকু যাওয়ার জন্য। বাড়ি ফিরে খানিকটা পড়াশোনাও তো করতে হবে। পপন ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

কিন্তু কলকাতায় ট্যাক্সি পাওয়া অত সোজা নয়। কেউই দাঁড়াতে চায় না। কেউ গ্যারেজ যাচ্ছে, কারুর সারাদিন খাওয়া হয়নি। আরেকজন তো অতি খারাপ। সে বলল, “খোকা, তোমার কাছে অত টাকা আছে তো?” পপন কোন উত্তর দিল না। ক্লাস টেনে উঠতে চলেছে। তাকে খোকা বলবে? শেষে একটা ট্যাকসি থামল। ড্রাইভার পপনকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাবেন?” শুনে নিতেও রাজি হলেন। তারপর একটা অদ্ভুত কথা শোনালেন। “আমার ট্যাক্সিটা কিন্তু একটু ভুতুড়ে, আপনি যেতে চাইছেন নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কী হয় বলতে পারি না।” চারিদিকে আলো, বাস চলছে, গাড়ি চলছে তার মধ্যে ভূতের কথার মানে কী? পপন বলল, “সে আবার কী?” ট্যাক্সিওয়ালা বললেন, “উঠে পড়ুন, হয়ত কিছু হবে না।” পপনের মনে হল, লোকটা একটু পাগল।
গাড়ি চলল সারকুলার রোড ধরে। এখন নাম হয়েছে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোড। কত বড় নাম। হঠাত্‌ পপনের মনে হল, ইদানীং কালে নাম হলে বিদ্যাসাগর স্ট্রীটের নাম হত দয়ার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সরণি। ভাবতেই পপনের হাসি পেল। সত্যি কারা এমন নামকরণ করে। পপন বোধহয় একটু অন্যমনস্ক ছিল। তাই কখন ব্যাপারটা হল টের পায়নি। যখন টের পেল, তখন দেখল গাড়িটা চলেছে একটা ফাঁকা রাস্তা দিয়ে। দুধারে ধানক্ষেত। ধান ফলে রয়েছে। কালো ধান। ও কখনো কালো ধান এর আগে দেখেনি। কিছুক্ষণ বাদে দেখল, শহর শুরু হয়েছে। একটা জায়গায় লেখা রয়েছে, শিবসাগর গড়কাপ্তানি অফিস। যাঃ বাবা, এ কোন জায়গা। বিরাট বিরাট দিঘি। সামনে মন্দির। মন্দিরের চুড়োয় হলুদ কলসী বসানো। ও দেখল, ট্যাক্সিড্রাইভারের চোখ প্রায় বোঁজা। পপনের ভীষণ ভয় হল। চেঁচিয়ে উঠল, এ আমায় কোথায় এনে ফেললেন।” ট্যাক্সি ড্রাইভারের চটকা ভেঙে গেল যেন, আর সঙ্গে সঙ্গে ট্যাক্সি আবার ফিরে এল এ পি সি রায় রোডে। পপন দারুণ অবাক হয়ে গেল। বলল, “কী ব্যাপার হল?”
ট্যাক্সি-ড্রাইভার বললেন, “বলেছিলাম না আমার ট্যাক্সিটা ভুতুড়ে? ওই হয়। আমার মনে যদি কখনো কোনো জায়গার কথা উদয় হয়, ট্যাক্সি অমনি সে-জায়গায় চলে যায়। আমার এক মাসতুতো বোনের কথা মনে পড়ছিল আপনার কপালে ফোঁটা দেখে। ভাইফোঁটা আমি প্রথম পেয়েছিলাম ওই বোনের কাছে। সে এখন শিবসাগরে থাকে। আমরা তাই শিবসাগরে চলে গিয়েছিলাম।”
পপন বলল, “ভারী মজার তো। আপনি গাড়ি থামালেন না কেন? আমি নেমে দেখতাম। কালো ধান দেখলাম। এর আগে কখনো দেখিনি।”
ট্যাক্সি-ড্রাইভার বললেন, “আমার তো কোনো হুঁশ থাকে না, আমি দেখতে পাই না। তবে শিবসাগর আমি গেছি। ওই অঞ্চলে একরকম কালো ধান হয়। তার নাম জোহা ধান। খুব ভাল চাল হয়।”
পপন জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আপনি জানেন গড়কাপ্তানী মানে কী?”
“হ্যাঁ জানি। গড়কপ্তানী হল পি-ডবলু-ডির ওইখানকার স্থানীয় নাম। আমরা পি-ডবলু-ডির কাছ অবধি গিয়েছিলাম কি?”
পপন উত্তর দিল, “আমরা একটা মন্দিরের কাছে গিয়েছিলাম।”
ট্যাক্সি ড্রাইভার বললেন, “হ্যাঁ ওই হচ্ছে বিখ্যাত শিবসাগরের মন্দির। ওপরে সোনার কলসী বসানো আছে। ওই মন্দিরের কাছেই আমার বোনের বাড়ি।”
পপনের বিশ্বাস করতেই ইচ্ছা করছিল না যে, ও এইমাত্র শিবসাগর ঘুরে এসেছে। অথচ ও তো সত্যিই দেখেছে শিবমন্দির ঘুরে এসেছে। অথচ ও তো সত্যিই দেখেছে শিবমন্দির আর কালো ধান। ও ওইরকম কলসবসানো মন্দির কখনো দেখেনি। ও ওইরকম কালো ধানও কখনো দেখেনি। কী করে হল? পপনের তখন ছোড়দির কাছে যাওয়ার তাড়া আর রইল না। ওর মনে হল এ তো দারুণ মজা। অধীর হয়ে ও জিজ্ঞেস করল, “আপনি যেখানে খুশি যেতে পারেন এভাবে?”
উত্তর এল, “হ্যাঁ, আমি যে জায়গার কথা মনে করি সেখানেই চলে যাই।”
পপন বলল, “আমার ভীষণ কাশ্মীর যাওয়ার ইচ্ছা, আপনি একবার কাশ্মীরের কথা ভাবুন না। কিংবা বিলেত বা আমেরিকা।”
ভদ্রলোক বিষণ্ণ স্বরে জবাব দিলেন, “আমি তো কখনো ওসব জায়গায় যাইনি। ভাবলেও ট্যাক্সি যাবে না।”
পপন বলল, “বা, আপনার তো খুব সুবিধে। অনেক জায়গা ঘুরতে পারেন।”
ভদ্রলোক বললেন, “মোটেও না। খদ্দেররা আমায় মারতে ওঠে। রোজ তো আর শিবসাগর যাই না। যে শিয়ালদহ যাচ্ছে সে যখন দেখে দমদম আসছে, তখন গালিগালাজ করে। কেউ ভয় পেয়ে যায়। এ ট্যাক্সিটা আমায় ছেড়ে দিতেই হবে।”
পপন ভেবেই পেল না কেন এ ট্যাকসি ছাড়বেন ভদ্রলোক। ও আবার জিজ্ঞাসা করলল, “আপনি কোথায় গিয়েছেন শিবসাগর ছাড়া?”
ভদ্রলোক বললেন, “আমার জন্ম পাটনায়। সেখানে ছাড়া আর কোথাও যাইনি। ওই একবার একমাস শিবসাগর ছিলাম।”
পপন বলল, “আপনি তাহলে পাটনার কথা ভাবুন।”
গাড়ি তখন শিয়ালদার ভিড় কাটিয়ে মৌলালীর দিকে এগোচ্ছে। ভদ্রলোক বললেন, “দেখি আপনার পাটনা দেখা হয় কিনা। গাড়ি মৌলালী পেরোল, এন্টালি বাজার পেরোল। জোড়া গির্জা প্রায় এসে গেছে। ভদ্রলোক চুপ। পপন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এবার পপনের মাথা একটু ঘুরে গেল। খুব জোরে লিফট ওপর দিকে উঠলে যেমনটি হয়। খুব জোরে লিফট ওপর দিকে উঠলে যেমনি হয়। তারপরই দেখল ওদের গাড়ি আর-একটা রাস্তা দিয়ে চলেছে। একদিকে প্রচুর বাঁশের গুদাম আর অন্য দিকে বিস্তৃত নদী। কী চওড়া। নদীর বুক দিয়ে একটা বিরাট স্টীমার চলেছে। এই সময়ে পপন একটা ভুল করল। “বাঃ কী সুন্দর” বলে হাততালি দিয়ে উঠল। ভদ্রলোকের চটকা আবার ভেঙে গেল। গাড়িও চলে এল বেকবাগানে।
ভদ্রলোকের বোধহয় পপনকে বেশ ভাল লেগেছিল। তিনি বললেন, “কী দেখলে? গঙ্গার ঘাট?” এই প্রথম উনি তুমি বললেন।
পপন বলল, “কই আর দেখলাম! একটু ভাল করে দেখতে গিয়েছি, অমনি তো বেকবাগান এসে পড়ল।”
পপনের নতুন জায়গা আর দেখা হল না। ভদ্রলোক অবিশ্যি পপনকে খিদিরপুর, বেহালা, গড়িয়া এইসব জায়গায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পপন ছোড়দির বাড়িই এল।
ছোড়দি এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। ট্যাক্সির বিল মিটিয়ে আসতেই সোজা খপ করে নিয়ে গিয়ে আসনে বসিয়ে দিল। বলল, “আর মাত্র আড়াই মিনিট দ্বিতীয়া আছে। তুই সারাজীবন আমায় জ্বালিয়েই গেলি।”
পপন ফোঁটা নিয়েই বলল, “দাঁড়া, আরও একজনকে ফোঁটা দিতে হবে।” ছুটে বেরিয়ে এসে দেখল-ট্যাকসিটা চলে গেছে। বোধহয় এখন শিবসাগরের সেই মন্দিরের ধারে আবার পৌঁছে গেছে। তখন পপনের খেয়াল হল, ভদ্রলোকের নাম-ঠিকানা কিংবা ট্যাক্সির নম্বর কিছুই রাখা হয়নি।